থাইরয়েডের কারণে নারীদের গর্ভধারণের জন্য কি কি সমস্যা হতে পারে
থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে। গলার সামনে অবস্থিত এই প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থিটি থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ করে, যা শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ঋতুচক্র এবং গর্ভধারণ পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
নারীদের বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভধারণজনিত জটিলতার পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। নিচে থাইরয়েডের কারণে নারীদের গর্ভধারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
থাইরয়েড ও প্রজনন স্বাস্থ্যের নিবিড় সম্পর্ক
নারীর শরীরে প্রজনন ক্ষমতা সচল রাখতে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের ভারসাম্য থাকা জরুরি। থাইরয়েড হরমোন সরাসরি ডিম্বাশয়ের (Ovary) কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে। যদি থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা খুব বেশি (হাইপারথাইরয়েডিজম) বা খুব কম (হাইপোথাইরয়েডিজম) হয়, তবে তা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যা গর্ভধারণকে কঠিন করে তোলে।
আরো পড়ুন: মেয়েরা কি কি সমস্যার কারণে বাচ্চা ধারন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে
হাইপোথাইরয়েডিজম এবং গর্ভধারণে বাধা
যখন থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। এটি নারীদের প্রজনন ক্ষমতায় নিম্নোক্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে:
- অ্যানোভুলেশন (Anovulation): থাইরয়েড হরমোনের অভাবে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ডিম্বাণু ছাড়া গর্ভধারণ অসম্ভব।
- ঋতুচক্রের অনিয়ম: এর ফলে পিরিয়ড খুব বেশি হওয়া (Menorrhagia), খুব কম হওয়া বা অনিয়মিত হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
- লুটিয়াল ফেজ ডিফেক্ট: গর্ভধারণের পর ভ্রূণকে জরায়ুতে আটকে রাখার জন্য প্রজেস্টেরন হরমোন প্রয়োজন। হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে এই হরমোন কমে যেতে পারে, ফলে ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপিত হতে পারে না।
- প্রোল্যাকটিন বৃদ্ধি: হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে শরীরে প্রোল্যাকটিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি ডিম্বাণু নিঃসরণে সরাসরি বাধা দেয়।
হাইপারথাইরয়েডিজম এবং প্রজনন জটিলতা
থাইরয়েড গ্রন্থি যখন অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করে, তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়। এটিও গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা:
- পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পিরিয়ড খুব হালকা হয়ে যায় বা মাসের পর মাস বন্ধ থাকে (Amenorrhea)।
- ডিম্বাণু অপরিণত থাকা: অতিরিক্ত হরমোনের কারণে ডিম্বাণু সঠিক সময়ে পরিপক্ক হয় না।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের প্রভাব ও ঝুঁকি
যদি কোনো নারী থাইরয়েড সমস্যা থাকা অবস্থায় গর্ভবতী হন, তবে সঠিক চিকিৎসা না নিলে মা ও সন্তান উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হয়।
ক) গর্ভপাত (Miscarriage)
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে গর্ভপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শরীর যখন ভ্রূণকে ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত হরমোন পায় না, তখন প্রাকৃতিকভাবেই গর্ভপাত ঘটে।
খ) অকাল প্রসব (Preterm Birth)
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে শিশুর ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গ সম্পূর্ণ গঠিত হওয়ার সুযোগ পায় না।
গ) প্রি-একলাম্পসিয়া (Pre-eclampsia)
এটি গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের একটি বিপজ্জনক অবস্থা। থাইরয়েডের রোগী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে, যা মা ও শিশু উভয়ের প্রাণের ঝুঁকি তৈরি করে।
ঘ) প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন (Placental Abruption)
এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে প্রসবের আগেই প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল জরায়ু থেকে আলাদা হয়ে যায়। এটি অত্যন্ত জরুরি অবস্থা এবং এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে।
গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব
গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের থাইরয়েড হরমোনের ওপর নির্ভর করতে হয়, বিশেষ করে প্রথম ১২-১৫ সপ্তাহ।
- মানসিক বিকাশ ও আইকিউ: যদি মায়ের থাইরয়েড হরমোন কম থাকে, তবে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ কম হতে পারে।
- জন্মগত ত্রুটি: কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যার কারণে শিশুর হৃদযন্ত্র বা স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- জন্মের সময় কম ওজন: অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েডের কারণে শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম ওজন নিয়ে জন্মাতে পারে।
অটোইমিউন থাইরয়েড ডিজিজ এবং বন্ধ্যাত্ব
অনেক সময় রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও 'থাইরয়েড অ্যান্টিবডি' উপস্থিত থাকে (যেমন: হাশিমোটো ডিজিজ)। এই অ্যান্টিবডিগুলো শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে এবং ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণে বাধা দেয়, যা বারবার গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।
করণীয় এবং প্রতিকার
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা ও চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব।
- পূর্ব-পরিকল্পনা: গর্ভধারণের আগে অবশ্যই থাইরয়েড পরীক্ষা (TSH, T3, T4) করা উচিত। TSH-এর মাত্রা ২.৫-এর নিচে রাখা গর্ভধারণের জন্য আদর্শ মনে করা হয়।
- নিয়মিত ওষুধ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী থাইরক্সিন হরমোন ট্যাবলেট গ্রহণ করা। গর্ভাবস্থায় ওষুধের ডোজ পরিবর্তন হতে পারে, তাই নিয়মিত ফলোআপ জরুরি।
- আয়োডিন যুক্ত খাবার: খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত আয়োডিন রাখা। তবে অতিরিক্ত আয়োডিন আবার হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণ হতে পারে, তাই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
- মানসিক প্রশান্তি: মানসিক চাপ থাইরয়েডের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। যোগব্যায়াম বা হালকা শরীরচর্চা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
উপসংহার
থাইরয়েড ও গর্ভধারণ একে অপরের পরিপূরক। নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্রের সামান্যতম অনিয়ম বা গর্ভধারণে বিলম্ব হলে শুরুতেই থাইরয়েড পরীক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (Endocrinologist) পরামর্শ গ্রহণ করলে থাইরয়েডের বাধা কাটিয়ে মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব। অবহেলা নয়, সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ মা ও সুস্থ শিশুর নিশ্চয়তা দিতে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url