ছেলেরা কি কি সমস্যার কারণে বাচ্চা ধারন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে

 পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়। সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা সমান, তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সমস্যার মূল কারণ থাকে পুরুষের শারীরিক বা জীবনযাত্রা সংক্রান্ত জটিলতা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, যদি কোনো দম্পতি এক বছর ধরে চেষ্টা করার পরও সন্তান ধারণে ব্যর্থ হন এবং তার কারণ পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান বা সংখ্যা সংক্রান্ত হয়, তবে তাকে পুরুষ বন্ধ্যাত্ব (Male Infertility) বলা হয়।

​নিচে ছেলেদের বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

শুক্রাণুর সমস্যা (Sperm Disorders)

​পুরুষের বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শুক্রাণুর গুণগত ও সংখ্যাগত ত্রুটি। এটি সাধারণত তিনটি উপায়ে হয়ে থাকে:

  • অল্প শুক্রাণু বা অলিগোস্পার্মিয়া (Oligospermia): যদি বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে (প্রতি মিলিলিটারে ১৫ মিলিয়নের কম), তবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।
  • শুক্রাণুর চলনশক্তি হ্রাস (Low Motility): ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছানোর জন্য শুক্রাণুকে সাঁতার কেটে অনেকটা পথ যেতে হয়। যদি শুক্রাণুর গতি কম থাকে, তবে তা জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
  • অস্বাভাবিক গঠন (Abnormal Morphology): শুক্রাণুর মাথা বা লেজের গঠন অস্বাভাবিক হলে তা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে অক্ষম হয়।
  • অ্যাজোস্পার্মিয়া (Azoospermia): বীর্যে যদি কোনো জীবিত শুক্রাণুই না থাকে, তবে তাকে সম্পূর্ণ বন্ধ্যাত্ব হিসেবে ধরা হয়।

ভ্যারিকোসিল (Varicocele)

​এটি পুরুষ বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান শারীরিক কারণ। অণ্ডকোষের ভেতরে অবস্থিত শিরাগুলো যখন অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, তখন তাকে ভ্যারিকোসিল বলে। এর ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা শুক্রাণু উৎপাদন এবং এর গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করে। এটি চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ঠিক করা সম্ভব।

​হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা

​শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি, হাইপোথ্যালামাস এবং অণ্ডকোষের হরমোনের সমন্বয় প্রয়োজন।

  • টেস্টোস্টেরনের অভাব: পুরুষের প্রধান যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন কমে গেলে যৌন ইচ্ছা এবং শুক্রাণু উৎপাদন কমে যায়।
  • থাইরয়েড ও অ্যাড্রিনাল সমস্যা: শরীরের অন্যান্য হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থির ত্রুটিও পরোক্ষভাবে প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

​শারীরিক ও অঙ্গসংস্থানিক সমস্যা

  • বীর্যপাতজনিত সমস্যা (Ejaculation Issues): কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে 'রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন' হয়, যেখানে বীর্য বাইরে না এসে উল্টো মূত্রথলিতে চলে যায়। এটি সাধারণত ডায়াবেটিস বা মেরুদণ্ডের আঘাতের কারণে হতে পারে।
  • সংক্রমণ (Infection): কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমণ যেমন এপিডিডাইমাইটিস বা অর্কাইটিস (অণ্ডকোষের প্রদাহ) শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা দেয়। এছাড়া যৌনবাহিত রোগ (STDs) যেমন ক্ল্যামিডিয়া বা গনোরিয়া শুক্রাণুর পথ আটকে দিতে পারে।
  • অবরুদ্ধ শুক্রবাহী নালী: আঘাত, অস্ত্রোপচার বা জন্মগত ত্রুটির কারণে শুক্রাণু বহনের নালীগুলো বন্ধ হয়ে থাকতে পারে।

​জীবনযাত্রা ও পরিবেশগত কারণ

​আধুনিক যুগের অনিয়মিত জীবনযাপন পুরুষ প্রজনন ক্ষমতার ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে:

  • অতিরিক্ত ধূমপান ও মদ্যপান: তামাক এবং অ্যালকোহল শুক্রাণুর সংখ্যা ও ডিএনএ-র ক্ষতি করে। ধূমপায়ী পুরুষদের শুক্রাণুর ঘনত্ব অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক কম হয়।
  • ড্রাগস বা মাদক সেবন: বিশেষ করে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড (যা অনেকে বডি বিল্ডিংয়ের জন্য নেন) অণ্ডকোষকে সংকুচিত করে দেয় এবং শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
  • স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত চর্বি শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটায় এবং শুক্রাণুর ডিএনএ নষ্ট করতে পারে।
  • অতিরিক্ত গরম: দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কাজ করা, টাইট অন্তর্বাস পরা বা গরম জলে স্নান করা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা শুক্রাণুর জন্য ক্ষতিকর।

​মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস

​অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা কাজের চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা প্রজনন হরমোনগুলোকে বাধা দেয়। এছাড়া বিষণ্ণতা বা দীর্ঘমেয়াদী দুশ্চিন্তা যৌন মিলনের ইচ্ছাকেও কমিয়ে দেয়।

​চিকিৎসা ও ওষুধের প্রভাব

  • কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন: ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রজনন ক্ষমতাকে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে।
  • নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ: উচ্চ রক্তচাপ বা বাতের ব্যথার জন্য ব্যবহৃত কিছু দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ শুক্রাণুর উৎপাদন কমিয়ে দেয়।

প্রতিরোধের উপায় ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন

​পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে বা ধরে রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • সুষম খাদ্য গ্রহণ: জিংক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার শুক্রাণুর মান উন্নত করে। যেমন- ডিম, বাদাম, কলা, এবং সবুজ শাকসবজি।
  • ব্যায়াম: ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি। তবে অতিরিক্ত ব্যায়াম বা স্টেরয়েড এড়িয়ে চলতে হবে।
  • নেশা বর্জন: ধূমপান এবং মদ্যপান ত্যাগ করা প্রজনন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ।
  • নিরাপদ যৌন সম্পর্ক: যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতন হওয়া জরুরি।
  • ঠান্ডা পরিবেশ: অণ্ডকোষের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকা এড়িয়ে চলা উচিত।

​উপসংহার

​বন্ধ্যাত্ব মানেই জীবনের শেষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন এবং সময়োপযোগী চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সামাজিক জড়তা। অনেক পুরুষই এই বিষয়ে কথা বলতে বা ডাক্তারের কাছে যেতে লজ্জা বোধ করেন। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হলে বাবা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়া সম্ভব। তাই কোনো সমস্যা সন্দেহ হলে দেরি না করে একজন ইউরোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url