শিশুদের হাম প্রতিরোধে করণীয় কি


শিশুদের হাম প্রতিরোধ ও প্রতিকার: একটি বিস্তারিত গাইডলাইন

​হাম বা মিজেলস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে যদি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। এটি প্রধানত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এর জীবাণু বাতাসে ভেসে অন্য শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে।

​আপনার শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হাম প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

​১. হাম কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?

​হাম মূলত মরবিলিভাইরাস (Morbillivirus) নামক একটি ভাইরাসের কারণে হয়। এটি শুধু সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি নয়; হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

​২. হাম প্রতিরোধের প্রধান উপায়: টিকাদান

​হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমআর (MR - Measles and Rubella) টিকা।

  • টিকার সময়সূচী: বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, শিশুকে সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়।
  • কেন দুই ডোজ জরুরি? এক ডোজ টিকা প্রায় ৮৫-৯০% সুরক্ষা দেয়, কিন্তু দ্বিতীয় ডোজটি সেই সুরক্ষাকে ৯৭-৯৯% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
  • ক্যাম্পেইন: সরকারিভাবে সময়ে সময়ে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন চালানো হয়। আপনার শিশু আগে টিকা পেয়ে থাকলেও ক্যাম্পেইনের সময় অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া অত্যন্ত নিরাপদ এবং জরুরি।

​৩. ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত সচেতনতা

​শুধুমাত্র টিকাই নয়, পরিচ্ছন্নতাও হাম ছড়ানো রোধে বড় ভূমিকা রাখে:

  • হাত ধোয়ার অভ্যাস: শিশুকে সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করান, বিশেষ করে খাবার আগে এবং বাইরে থেকে ফেরার পর।
  • হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার: শিশুকে শেখান যাতে হাঁচি বা কাশির সময় রুমাল বা কনুই দিয়ে মুখ ঢেকে রাখে।
  • ভিড় এড়িয়ে চলা: এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জনাকীর্ণ স্থান বা মেলা থেকে শিশুকে দূরে রাখুন।

​৪. পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

​অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের হামের জটিলতা বেশি হয়। তাই শিশুর ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • ভিটামিন-এ (Vitamin A): হাম প্রতিরোধে ভিটামিন-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাম হলে শরীর থেকে ভিটামিন-এ দ্রুত কমে যায়, যা শিশুকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে। টিকাদান কেন্দ্রে শিশুকে নিয়মিত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ান।
  • বুকের দুধ: ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ান। এটি শিশুর শরীরে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
  • সুষম খাবার: পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখুন।

​৫. শিশু হামে আক্রান্ত হলে যা করবেন

​যদি আপনার শিশু হামে আক্রান্ত হয়েই যায়, তবে অন্য শিশুদের বাঁচাতে এবং নিজের শিশুর সুস্থতায় নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:

পদক্ষেপ

বিস্তারিত বিবরণ

বিচ্ছিন্ন রাখা (Isolation)

আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৭-১০ দিন সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা ঘরে রাখুন। তার ব্যবহৃত থালা-বাসন বা কাপড় আলাদা রাখুন।



তরল খাবার

জ্বরের সময় শরীর জলশূন্য হয়ে পড়ে। তাই প্রচুর পানি, ডাবের পানি, সুপ এবং ফলের রস খাওয়ান।



জ্বর নিয়ন্ত্রণ

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ দিন। শরীর হালকা কুসুম গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে মুছে দিন।


চোখ ও মুখের যত্ন

পরিষ্কার তুলা বা নরম কাপড় দিয়ে শিশুর চোখ পরিষ্কার রাখুন।



৬. কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

​হামের সাধারণ লক্ষণের বাইরে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে:

  • ​শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে বা খুব দ্রুত শ্বাস নিলে।
  • ​অবিরাম বমি করলে বা খেতে না পারলে।
  • ​শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়লে বা খিঁচুনি হলে।
  • ​কান দিয়ে পুঁজ পড়লে।
  • ​চোখ লাল হয়ে ফুলে গেলে বা ঝাপসা দেখলে।

​৭. কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা ও সতর্কতা

​আমাদের সমাজে হাম নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে, যা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে:

  • গোসল না করানো: অনেকে মনে করেন হাম হলে গোসল করানো যাবে না। এটি ভুল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হালকা গরম পানিতে শরীর মোছানো বা গোসল করানো প্রয়োজন। তবে ঠান্ডা লাগানো যাবে না।
  • খাদ্য নিষেধ: হাম হলে মাছ-মাংস বন্ধ করে দেওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এই সময় শিশুর বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়।
  • কবিরাজি চিকিৎসা: ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি ওষুধে সময় নষ্ট না করে আধুনিক চিকিৎসা ও টিকার ওপর ভরসা রাখুন।

​উপসংহার

​হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে টিকাদানই পারে আপনার শিশুকে এই মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করতে। আপনার শিশুর টিকাদানের কার্ডটি চেক করুন এবং নিশ্চিত করুন সে দুটি ডোজই পেয়েছে কি না। মনে রাখবেন, আপনার একটু সচেতনতা একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

সতর্কতা: হামের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না। অবশ্যই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url