মেয়েরা কি কি সমস্যার কারণে বাচ্চা ধারন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে

সন্তান ধারণের ক্ষমতা বা প্রজনন ক্ষমতা একটি নারীর জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সময়ে পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশগত নানা কারণে নারীদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটি (Infertility) একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, যদি কোনো দম্পতি কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে এক বছর নিয়মিত চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণে ব্যর্থ হন, তবে তাকে বন্ধ্যাত্ব বলা হয়।

​মেয়েদের বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পেছনে নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক এবং জীবনধারা সংক্রান্ত কারণ থাকতে পারে। নিচে বিস্তারিতভাবে এই কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

হরমোনজনিত সমস্যা (Hormonal Imbalance)

​নারীদের প্রজনন প্রক্রিয়ার মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে হরমোনের হাতে। হরমোনের সামান্য তারতম্যও গর্ভধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

  • পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS): বর্তমানে এটি নারীদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। এতে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, ফলে ডিম্বাশয় থেকে নিয়মিত ডিম্বাণু নির্গত (Ovulation) হয় না। এছাড়া অনিয়মিত পিরিয়ড এবং শরীরে পুরুষ হরমোনের আধিক্য দেখা দেয়।
  • থাইরয়েড সমস্যা: থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হরমোন প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। থাইরয়েডের মাত্রা খুব বেশি (Hyperthyroidism) বা খুব কম (Hypothyroidism) হলে পিরিয়ড অনিয়মিত হতে পারে এবং ডিম্বাণু উৎপাদনে সমস্যা হয়।
  • প্রোল্যাকটিন হরমোনের আধিক্য: পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে যদি অতিরিক্ত প্রোল্যাকটিন হরমোন নিঃসরণ হয়, তবে তা ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন বন্ধ করে দিতে পারে।

​ডিম্বাশয় বা ওভারির সমস্যা

​ডিম্বাশয় থেকে সুস্থ ডিম্বাণু তৈরি না হলে গর্ভধারণ অসম্ভব।

  • অকাল ডিম্বাশয় ব্যর্থতা (Premature Ovarian Failure): সাধারণত ৪০ বছরের আগে যদি ডিম্বাশয় কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং ডিম্বাণু উৎপাদন না করে, তবে তাকে প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিউর বলা হয়। এটি জেনেটিক কারণে বা অটোইমিউন রোগের কারণে হতে পারে।
  • ডিম্বাণুর গুণমান হ্রাস: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণমান (Quality) কমতে থাকে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর নারীদের গর্ভধারণ ক্ষমতা দ্রুত কমতে শুরু করে।

ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা

​ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর মিলনের জন্য ফ্যালোপিয়ান টিউব বা ডিম্বনালীর ভূমিকা অপরিসীম। যদি এই নালী কোনো কারণে বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত থাকে, তবে শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পারে না।

  • টিউবাল ব্লকেজ: পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID), যৌনবাহিত রোগ (যেমন- ক্ল্যামিডিয়া বা গনোরিয়া) বা পূর্বের কোনো অস্ত্রোপচারের ফলে ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis): এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণ (টিস্যু) জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে। এর ফলে ফ্যালোপিয়ান টিউবে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে এবং ডিম্বাণু চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

​জরায়ুর সমস্যা (Uterine Problems)

​জরায়ু যদি সুস্থ না থাকে, তবে ভ্রূণ সেখানে নিজেকে স্থাপন (Implantation) করতে পারে না।

  • জরায়ু টিউমার বা ফাইব্রয়েডস (Fibroids): জরায়ুর দেয়ালে ছোট ছোট টিউমার বা মাংসপিণ্ড হলে তা ভ্রূণ স্থাপনে বাধা দেয়। এটি জরায়ুর আকারও পরিবর্তন করে দিতে পারে।
  • জরায়ুর জন্মগত ত্রুটি: কিছু নারীর জরায়ুর গঠন জন্মগতভাবেই অস্বাভাবিক থাকে, যা গর্ভধারণ বা গর্ভকাল পূর্ণ করতে বাধা দেয়।
  • জরায়ুর ইনফেকশন: দীর্ঘমেয়াদী ইনফেকশনের কারণে জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে দাগ পড়ে যেতে পারে, যা প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

বয়স (Age Factor)

​চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, মেয়েদের গর্ভধারণের জন্য ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স সবচেয়ে উপযুক্ত। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মেয়েদের প্রজনন ক্ষমতা কমতে থাকে। ৩৫ বছরের পর ডিম্বাণুর সংখ্যা দ্রুত কমে যায় এবং অবশিষ্ট ডিম্বাণুগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিকতা (Chromosomal abnormalities) দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

আরো পড়ুন: উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা

​জীবনধারা এবং অভ্যাস (Lifestyle Factors)

​আধুনিক জীবনযাপনের অনেক অভ্যাস সরাসরি প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে:

  • অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা: শরীরের অতিরিক্ত চর্বি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ডিম্বস্ফোটনে ব্যাঘাত ঘটায়।
  • অত্যধিক কম ওজন: শরীরের ওজন যদি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম থাকে, তবে শরীর ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরি করতে পারে না, যার ফলে পিরিয়ড এবং ওভুলেশন বন্ধ হয়ে যায়।
  • মানসিক চাপ (Stress): অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ মস্তিষ্কের সেই অংশকে প্রভাবিত করে যা প্রজনন হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে।
  • ধূমপান ও মদ্যপান: ধূমপান করলে ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা কমে যায় এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অ্যালকোহলও প্রজনন ক্ষমতার জন্য ক্ষতিকর।
  • অপুষ্টি: খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় ভিটামিন (যেমন- ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১২) এবং মিনারেলের অভাব বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।

যৌনবাহিত রোগ (STDs)

​অরক্ষিত যৌন মিলনের ফলে সিফিলিস, গনোরিয়া বা ক্ল্যামিডিয়ার মতো রোগ হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এই সংক্রমণ জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বা বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে।

পরিবেশগত ও রাসায়নিক প্রভাব

​কর্মক্ষেত্রে বা পরিবেশে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, কীটনাশক, তেজস্ক্রিয়তা বা সীসার সংস্পর্শে আসা নারীদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপাদান (BPA) হরমোনের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

​দীর্ঘমেয়াদী রোগ এবং ওষুধ

  • ক্যান্সার ও কেমোথেরাপি: ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি ডিম্বাশয়ের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।
  • ডায়াবেটিস ও অটোইমিউন রোগ: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগ প্রজনন ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
  • অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার: দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করলে ওভুলেশন সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায়

​প্রজনন ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং বন্ধ্যাত্ব এড়াতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:

​১. সুষম খাবার: খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি (যেমন- বাদাম, মাছের তেল) রাখুন।

২. ওজন নিয়ন্ত্রণ: বডি মাস ইনডেক্স (BMI) সঠিক মাত্রায় রাখার চেষ্টা করুন।

৩. ব্যায়াম: নিয়মিত হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে।

৪. নিয়মিত চেকআপ: পিরিয়ড অনিয়মিত হলে বা প্রজননতন্ত্রের কোনো সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

৫. মানসিক প্রশান্তি: যোগব্যায়াম বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।

৬. নেশা বর্জন: ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।

উপসংহার

​বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা বা বন্ধ্যাত্ব একটি কষ্টকর পরিস্থিতি, তবে এটি সবসময় স্থায়ী নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আইভিএফ (IVF), আইইউআই (IUI) এবং হরমোন থেরাপির মতো অনেক উন্নত পদ্ধতি রয়েছে যার মাধ্যমে অনেক নারী মাতৃত্বের স্বাদ পাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। সঠিক সময়ে সমস্যা শনাক্ত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা হলে অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব। কোনো সমস্যা অনুভূত হলে লোকলজ্জার ভয়ে না থেকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url