কলার পুষ্টিগুণ কলার উপকারিতা এবং অপকারিতা

 কলা আমাদের বাংলাদেশের সকলের পরিচিত একটি তাজা এবং সতেজ ফল যা সহজলভ্য এবং মূল্য অনেক কম। কলার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে যা সাহায্য করে আমাদের শরীরের কার্যকারিতা কে উন্নত করতে, রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হজম ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে কলা খাওয়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন।


কলা সর্বপ্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে পাওয়া যেত। তবে কলার পুষ্টি গুণাগুণের উপর নির্ভর করে এখন সারা বিশ্বে এই কলার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে কম বেশি কলা খেয়ে  থাকি। কিন্তু কলার পুষ্টি গুণ, খাওয়ার উপকারিতা  ও অপকারিতা সম্পর্কে আমাদের অবগত হওয়া খুবই প্রয়োজন। আজ আমরা এই আর্টিকেলটিতে কলার পুষ্টি গুনাগুন ও কলা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানবো।

আরো পড়ুন ঃতরমুজ খাওয়ার উপকারিতা অপকারিতা ও পুষ্টি গুনাগুন

কলার পুষ্টি  গুনাগুণ ও ভিটামিন সমূহ 

১০০ গ্রাম কলার পুষ্টিগত গুনাগুন বা নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টঃ

  • ক্যালোরি ৮৯%
  • কার্বোহাইড্রেট ২২.৮ গ্রাম (ডায়েটারি ভাইবার ২.৬ গ্রাম)
  • টোটাল ফ্যাট ০.৩৩ গ্রাম (স্যাচুরেটেড ফ্যাট ০.১ গ্রাম) 
  • প্রোটিন ১.০৯ গ্রাম।
  • সুগার ১২.২ গ্রাম।
এছাড়াও আছে বিভিন্ন রকমের ভিটামিন এবং মিনারেল যেমন ঃ
  • ভিটামিন এ
  • ভিটামিন সি 
  • ভিটামিন বি ৬
  • ভিটামিন ই 
  • ভিটামিন কে 
  • ক্যালসিয়াম 
  • আয়রন 
  • ম্যাগনেসিয়াম 
  • ফসফরাস 
  • পটাশিয়াম 
  • জিংক 
  • সোডিয়াম 
  • কপার 
  • সেলেনিয়াম ইত্যাদি

কলা খাওয়ার উপকারিতা  সমূহ 

কলা শরীরের শক্তি যোগায়

আপনি দ্রুত শক্তি চান, তাহলে ঝটপট ২টি পাকা কলা খেয়ে ফেলুন। এটি নিমিষেই আপনাকে শক্তি সাপ্লাই করতে শুরু করবে। কারণ কলায় আছে প্রচুর গ্লুকোজ ও ফরুক্টোজ এগুলো হজম করার দরকার নাই শুধু রক্তে মিশে যায়। আবার এতে যে ডায়াটরি ফাইবার আছে তা সুগার ফাস্ট গতিতে হজম হয়ে আরও গ্লুকোজ তৈরি করে যা প্রচুর শক্তির যোগান দেয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে

কলা হলো রক্তে সুগার বেশি থাকে। আপনি মিষ্টি বা শর্করা জাতীয় খাবার খেলে তা দ্রুত হজম হয়ে রক্তে মিশে যায় এবং শর্করার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করে। এতে করে ডায়াবেটিস বাড়ে। কম পাকা কলায় যে শর্করা থাকে তা রেসিট্যান্স  স্টার্চ  এটি সহজে হজম হয় না। এটি অল্প করে হজম হয় আর রক্তে মিশে ফলে শর্করার আর মাত্রা ঠিক থাকে।

কলা  হার্টকে ভালো রাখে 

কলাতে আছে প্রচুর পটাশিয়াম এটি হার্টের পেশি গুলোকে তাজা রাখে। হার্ট  হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। মস্তিষ্কের স্টোক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক অংশ হ্রাস করে। কলা ব্লাড প্রেসার কমাতে  অত্যন্ত উপকারী।

কলা কিডনি সুস্থ রাখে

কলার পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম কিডনির কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় যে, যেসব ব্যক্তি প্রতিদিন কলা খান তাদের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৪০ ভাগ কম। কলা কিডনি পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করে।  মূত্রতন্ত্রের ইনফেকশন কমাতে এর অবদান আছে।

কলা আলসার ভালো করে

পেটে আলসার হলে কলা খান। কলার মিউসিলেজ পাকস্থলীর ভিতরের প্রাচীরে ক্ষতিগ্রস্ত  মিউকাস পর্দাকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে ।কলার ফাইবার গ্যাস্টিক হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।

কলা হজমে সহায়তা করে 

চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করার ৩০মিনিট পর একটি পাকা কলা খেলে দ্রুত চর্বি হজম হয়ে যায়। চর্বি ক্ষতিকর অংশ খুব সহজে পরিপাক হয় কলার কারণে। কলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার থাকায় এটি হজমে সহায়তা করে। কলায় থাকে পেকটিন নামক একটি ফাইবার যা কোষ্ঠকাঠিন্যের মত সমস্যার দূরে রাখতে সাহায্য করে।

আরো পড়ুন ঃ আঙ্গুরের  উপকারিতা পুষ্টিগণ ও লাল আঙ্গুরের উপকারিতা 

কলার ভিটামিন

কলাতে A টু Z ভিটামিন আছে। চিন্তা করুন শুধু কলা খেলেই আপনি সব ভিটামিন পাবেন। বাজার থেকে কোন ভিটামিনের কৌটা কিনতে হবে না। এতে থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ভিটামিন বি ও সি শরীরের জন্য দারুন উপকারি।

কলা তারুণ্য ধরে রাখে

কলার ভিটামিন ও অন্যান্য উপাদান কোষকে অকালে ঝড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। ত্বকের কোষে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে কলা তাই ত্বকের লাবণ্যতা বজায় থাকে। এর ভিটামিন ই যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। কলার ম্যাগনেসিয়াম ত্বকের কেলাজেন গঠনে সহায়তা করে এবং ত্বকে ফ্রি রেডিকেল জনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।

কলা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

বেশি পাকা কলায় TNF-A  নামক এক ধরনের যৌগ আছে যা শরীরের  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্বেত রক্ত কণিকার পরিমাণ বাড়ায়। এতে করে ব্লাড ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

কলা মানসিক চাপ কমায়

 ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামিনো এসিড কলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি রক্তে মিশে যাওয়ার পর রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সেরোটোনিনে রূপান্তরিত হয়। আনন্দদায়ক অনুভূতি সৃষ্টির জন্য সেরোটোনিন কাজ করে।সেরোটোনিনের সঠিক  মাত্রা আপনার মন ভালো রাখবে এবং মানসিক চাপ কমাবে। মনতো মন  ফুরফুরা তাহলে ভালো ঘুম তো এমনই হবে। এর মধ্যেও রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়াম যা বিষন্নতা রোধে কাজ করে।

রক্ত বৃদ্ধি করে

কলাতে ভিটামিন বি৬ থাকে, এটি রক্তের লোহিত কণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি করে। কলার ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে ফলে হাড় থেকে রক্ত কণিকা ভালো মাত্রায় উৎপন্ন হয় এবং রক্তস্বল্পতা কমায় ।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

কলায় প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড নামক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আছে যা প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় । এর ভিটামিন ই প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো করে। ভিটামিন এ কলায় প্রচুর আছে ফলে এটি আপনার চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে।

স্মৃতিশক্তি বাড়াই কলা

প্রতিদিন ১টি করে কলা খেলে আপনার মস্তিষ্কের স্মৃতি  ভান্ডার শক্তিশালী হবে মানে আপনার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পাবে। এর বিভিন্ন উপাদান মগজের প্রয়োজনীয় খাদ্যের যোগান দেয়।

আরো পড়ুন ঃ

কলা খাওয়ার সঠিক সময় বা নিয়ম

  • কলা খাওয়ার সব থেকে ভালো ও সঠিক সময় হল সকালে ব্রেকফাস্ট/নাস্তার করার পরে।
  • কলা দুপুরের খাবারের পরে বা লাঞ্চের পরেও খেতে পারেন তবে কলা খালি পেটে না খাওয়াই ভালো।

কলা খাওয়ার অপকারিতা

  • খালি পেটে কলা খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেড়ে যাবে।
  • বেশি মাত্রায় কলা খেলে শরীরে উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় ফলে হার্টের রোগ হতে পারে।

  • যাদের দেহের পটাশিয়ামের লেভেল বেশি তাদের কলার ও অপকারিতা ভালো করে জানা উচিত কারণ করার পটাশিয়াম দেহের পটাশিয়াম লেভেল কে আরো বৃদ্ধি করবে এতে আইবার ক্যালিমিয়া রোগ হতে পারে।

  • রাতের বেলা বেশি পরিমাণ কলা খেলে আমাদের অনিদ্রার সমস্যা হতে পারে। তার কারণ কলা আমাদের শরীরে এনার্জি বা শক্তিকে বাড়িয়ে দেয় যার ফলে আমাদের দ্রুত ঘুম আসতে চায় না।
  • আমাদের যদি ঠান্ডা লেগে থাকে তবে কলা না খাওয়াই ভালো। তার কারণ বেশি পরিমাণ কলা খেলে আমাদের ঠান্ডা লাগার প্রবণতা আরো বেড়ে যায়।
  • ফাইবার আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান যা আমরা কলাতে পেয়ে থাকি তবে খুব বেশি কলা খেলে আমাদের শরীরের ওজন বাড়তে পারে।
  • কলাতে সুগার এবং কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, তাই খুব বেশি কলা গ্রহন করলে বা খেলে আমাদের দাঁতের সমস্যা হতে পারে তার কারণ খুব বেশি সুগার এবং কার্বহাইড্রেট আমাদের দাঁতের জন্য ভালো না
  • বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ফলে বা সবজিতে অ্যালার্জি থাকতে পারে তাই যদি কলা খেয়ে আপনাদের অ্যালার্জি বাড়তে থাকে তবে তবে অবশ্যই কলা খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
  •  যাদের শ্বাস যন্ত্রের সমস্যা আছে বেশি মাত্রায় কলা খেলে তা বেড়ে যেতে পারে।
  • আপনি চরম লেভেলের ডায়াবেটিকস রোগী হলে একদম পাকা কলা খাবেন না। এটি আপনার সুগার লেভেল বিপদ মাত্রা অতিক্রম করে দিতে পারে।
  • মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে কলা না খেলেই ভাল হয়। করাতে টাই রামায়ণ নামক এক ধরনের উপাদান থাকে যা মাইগ্রেনের অন্যতম কারণ।
কলার অপকারিতা জেনে আবার কলা খাওয়া বাদ দিয়েন না উপকারের সাপেক্ষে কলার অপকারিতা অতি নগণ্য। তাই সমস্যা না থাকলে প্রত্যেকদিন ২-৩টি করে কলা অনায়াসে খেতে পারেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url