পুষ্টি জনিত অভাবের কারণে কি কি ধরনের রোগ হতে পারে
পুষ্টির অভাবজনিত রোগ: কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার সর্ম্পকে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ভূমিকা
মানবদেহকে সুস্থ, সবল এবং কার্যক্ষম রাখতে সুষম খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যা খাই, তা থেকে আমাদের শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। এই পুষ্টি উপাদানগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয় ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট (শর্করা, আমিষ ও চর্বি) এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (ভিটামিন ও খনিজ লবণ)। যখন আমাদের শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে এক বা একাধিক পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা বা রোগ সৃষ্টি হয়। একেই পুষ্টির অভাবজনিত রোগ (Nutritional Deficiency Diseases) বলা হয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপুষ্টি একটি অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা। তবে অসচেতনতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে উন্নত বিশ্বেও পুষ্টির অভাবজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। নিচে পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগ, তাদের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রোটিন ও শক্তির অভাবজনিত রোগ (Protein-Energy Malnutrition - PEM)
শরীরের বৃদ্ধি, কোষ গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য প্রোটিন এবং শক্তির (ক্যালোরি) ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর অভাব হলে মারাত্মক দুটি রোগ দেখা দেয়:
ক) কোয়াশিয়রকর (Kwashiorkor)
এই রোগটি সাধারণত ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যখন তারা মায়ের বুকের দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পায় না।
লক্ষণ:
শিশুর হাত-পা চিকন হয়ে যায় কিন্তু পেট ফুলে বড় হয়ে যায় (এডিমা বা শরীরে পানি জমা)।
ত্বক খসখসে হয়ে ফেটে যায় এবং চুলের রঙ তামাটে বা ফেকাসে হয়ে যায়।
লিভার বড় হয়ে যাওয়া এবং শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
প্রতিকার: শিশুকে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন— দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল এবং বাদাম খাওয়াতে হবে।
খ) ম্যারাসমাস (Marasmus)
এটি প্রোটিন এবং ক্যালোরি— উভয়েরই তীব্র অভাবের কারণে ঘটে। সাধারণত এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ:
শিশু অত্যন্ত রোগা ও হাড্ডিসার হয়ে পড়ে। চামড়া কুঁচকে যায়, ফলে শিশুকে দেখতে বৃদ্ধ মানুষের মতো লাগে।
শরীরে কোনো চর্বি বা পেশি অবশিষ্ট থাকে না।
চরম দুর্বলতা এবং ঘন ঘন ডায়রিয়া বা অন্যান্য ইনফেকশন হওয়া।
প্রতিকার: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে পর্যাপ্ত ক্যালোরি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ তরল ও নরম খাবার অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াতে হবে।
ভিটামিনের অভাবজনিত রোগ
ভিটামিন শরীরে খুব সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন হলেও এর অভাবে শরীর অচল হয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন ভিটামিনের অভাবে ভিন্ন ভিন্ন রোগ হয়:
ক) ভিটামিন ‘এ’-র অভাব: রাতকানা ও জেরোপথালমিয়া
ভিটামিন ‘এ’ আমাদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
লক্ষণ:
রাতকানা (Night Blindness): মৃদু আলোতে বা রাতে স্পষ্ট দেখতে না পাওয়া। এটি ভিটামিন ‘এ’র অভাবের প্রথম লক্ষণ।
জেরোপথালমিয়া (Xerophthalmia): অভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যায়, চোখ আলসার হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উৎস ও প্রতিকার: কলিজা, ডিমের কুসুম, গাঢ় সবুজ শাকসবজি (পালং শাক, লাল শাক), এবং হলুদ-কমলা রঙের ফল ও সবজি (মিষ্টি কুমড়া, গাজর, পাকা আম, পেঁপে)।
খ) ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্সের অভাব
ভিটামিন ‘বি’ গ্রুপের মধ্যে অনেকগুলো ভিটামিন রয়েছে। এদের অভাবে বিভিন্ন রোগ হয়:
বেরিবেরি (ভিটামিন B_1 বা থায়ামিনের অভাব): এর ফলে হাত-পা অবশ হওয়া, পেশি দুর্বল হওয়া এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে।
রিবোফ্লাভিনোসিস (ভিটামিন B_2 বা রিবোফ্লাভিনের অভাব): ঠোঁটের কোণায় ও মুখে ঘা (Cheilosis) হওয়া এবং জিহ্বায় ঘা হওয়া।
পেলাগ্রা (ভিটামিন B_3 বা নিয়াসিনের অভাব): এর প্রধান লক্ষণ তিনটি— ডায়রিয়া, চর্মরোগ (Dermatitis) এবং স্মৃতিভ্রম (Dementia)।
রক্তস্বল্পতা (ভিটামিন B_{12} ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব): এর অভাবে লোহিত রক্তকণিকা ঠিকমতো তৈরি হতে পারে না, ফলে শরীর ফ্যাকাশে ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
উৎস ও প্রতিকার: ঢেঁকি ছাঁটা চাল, লাল আটা, ডাল, বাদাম, দুধ, ডিম এবং সবুজ শাকসবজি।
গ) ভিটামিন ‘সি’-র অভাব: স্কার্ভি (Scurvy)
ভিটামিন ‘সি’ বা অ্যাসকরবিক অ্যাসিড শরীরের কোলাজেন তৈরিতে এবং ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।
লক্ষণ:
মাড়ি ফুলে যাওয়া, নরম হওয়া এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়া।
দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া বা পড়ে যাওয়া।
ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হওয়া এবং সামান্য আঘাতেই কালশিটে পড়া।
শরীরের যেকোনো ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগা।
উৎস ও প্রতিকার: সব ধরনের টক জাতীয় ফল যেমন— আমলকী, লেবু, কমলা, পেয়ারা, মালটা এবং কাঁচা মরিচ।
ঘ) ভিটামিন ‘ডি’-র অভাব: রিকেটস ও অস্টিওম্যালেসিয়া
ভিটামিন ‘ডি’ শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড় ও দাঁত মজবুত রাখার জন্য অপরিহার্য।
লক্ষণ:
রিকেটস (Rickets): এটি শিশুদের হয়। এর ফলে শিশুদের হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায় এবং পায়ের হাড় বেঁকে (Bow legs) যায়।
অস্টিওম্যালেসিয়া (Osteomalacia): এটি বয়স্কদের হয়। এর ফলে হাড় দুর্বল, ভঙ্গুর ও নরম হয়ে যায় এবং পিঠে ও কোমরে তীব্র ব্যথা হয়।
উৎস ও প্রতিকার: ভিটামিন ‘ডি’-র সবচেয়ে বড় উৎস হলো সূর্যের আলো। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম এবং দুধ খাওয়া উচিত।
খনিজ লবণের (Minerals) অভাবজনিত রোগ
আমাদের শরীরের হাড় গঠন, হরমোন তৈরি এবং স্নায়ুতন্ত্র সচল রাখতে খনিজ লবণ অপরিহার্য।
ক) আয়রনের অভাব: অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা
বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে।
লক্ষণ:
অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত ও হাঁপিয়ে ওঠা, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা এবং হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
নখ চামচের মতো বেঁকে যাওয়া (Koilonychia) এবং চুল পড়া।
উৎস ও প্রতিকার: লাল মাংস, কলিজা, চিংড়ি, কচুশাক, পালং শাক, ডাল, খেঁজুর এবং ডালিম।
খ) আয়োডিনের অভাব: গলগণ্ড (Goiter) ও ক্রেটিনিজম
আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, যা শরীরের বিপাক ও মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে।
লক্ষণ:
গলগণ্ড: থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে গিয়ে গলা বড় হয়ে যাওয়া।
হাইপোথাইরয়েডিজম: ওজন বৃদ্ধি, অলসতা এবং ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা।
ক্রেটিনিজম: গর্ভাবস্থায় মায়ের আয়োডিনের অভাব হলে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং শিশু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হতে পারে।
উৎস ও প্রতিকার: আয়োডিনযুক্ত লবণ এবং সামুদ্রিক মাছ ও সি-ফুড খাওয়া।
গ) ক্যালসিয়ামের অভাব: অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis)
ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের মূল উপাদান। রক্ত জমাট বাঁধতে এবং পেশি সংকোচনেও এর ভূমিকা রয়েছে।
লক্ষণ:
হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা পাতলা হয়ে যাওয়া, ফলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া।
পেশিতে টান লাগা বা ক্র্যাম্প হওয়া এবং দাঁত দুর্বল হওয়া।
উৎস ও প্রতিকার: দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ (কাঁটাসহ), এবং সবুজ শাকসবজি।
ঘ) জিঙ্কের অভাব
জিঙ্ক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কোষ বিভাজন এবং রুচি বাড়াতে কাজ করে।
লক্ষণ:
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া এবং ঘন ঘন ইনফেকশন বা ডায়রিয়া হওয়া।
চুল পড়ে যাওয়া এবং ত্বকে র্যাশ হওয়া।
খাবারে অরুচি এবং শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি কমে যাওয়া।
উৎস ও প্রতিকার: মাংস, বাদাম, শস্যদানা এবং দুগ্ধজাত খাবার।
পুষ্টির অভাবজনিত রোগের প্রধান কারণসমূহ
পুষ্টির অভাব কেবল পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়ার কারণেই হয় না, এর পেছনে আরও বেশ কিছু সামাজিক ও শারীরিক কারণ থাকে।
১. দারিদ্র্য এবং অসচেতনতা: পুষ্টিকর খাবারের উচ্চ মূল্য এবং কোন খাবারে কী পুষ্টি আছে সে সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব।
২. ভুল খাদ্যভ্যাস: অতিরিক্ত ফাস্টফুড, প্রসেসড ফুড বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার কারণে পেট ভরলেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না।
৩. শোষণজনিত সমস্যা (Malabsorption): অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার খেলেও পেটের রোগ (যেমন- সিলিয়াক ডিজিজ, ক্রোনস ডিজিজ বা কৃমির সংক্রমণ) এর কারণে শরীর পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে পারে না।
৪. বিশেষ শারীরিক অবস্থা: গর্ভাবস্থা, স্তন্যদানকাল এবং শৈশবে শরীরে পুষ্টির চাহিদা সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এই সময়ে বাড়তি পুষ্টি না পেলে অভাবজনিত রোগ দেখা দেয়।
পুষ্টির অভাব প্রতিরোধে করণীয়
পুষ্টির অভাবজনিত রোগগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সুষম খাদ্য তালিকা (Balanced Diet): প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শর্করা, আমিষ, চর্বির পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল রাখতে হবে, যা ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণ করবে।
খাদ্য বৈচিত্র্য (Dietary Diversity): প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন রঙের এবং স্বাদের প্রাকৃতিক খাবার খাওয়া উচিত।
সচেতনতা বৃদ্ধি: গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া এবং শিশুকে জন্মের প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ এবং এরপর থেকে ঘরের তৈরি পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার দেওয়া।
কৃমি নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করা, কারণ কৃমি শরীরের পুষ্টি উপাদান শুষে নেয় এবং রক্তস্বল্পতা তৈরি করে।
ফোর্টিফাইড ফুড বা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার: আয়োডিনযুক্ত লবণ বা ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ভোজ্য তেলের মতো কৃত্রিমভাবে পুষ্টি যুক্ত করা খাবার গ্রহণ করা।
উপসংহার
পুষ্টির অভাবজনিত রোগ কোনো সংক্রামক ব্যাধি নয়, বরং এটি আমাদের খাদ্যভ্যাস ও সচেতনতার সাথে সরাসরি জড়িত। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে পুষ্টির ভূমিকা অপরিসীম। তাই রোগাক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চেয়ে, দৈনিক খাদ্য তালিকায় সামান্য পরিবর্তন এনে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করা অনেক বেশি সহজ ও বুদ্ধিমত্তার কাজ। "প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে উত্তম"— এই নীতি মেনে আমাদের পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণে সচেতন হতে হবে।

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url