জন্ডিস রোগের লক্ষন ও প্রতিকারের উপায়
এই আর্টিকেলটিতে জন্ডিস রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায় সর্ম্পকে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ভূমিকা
জন্ডিস (Jaundice) কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়; বরং এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ, যা সাধারণত লিভার, পিত্তথলি বা রক্তের কিছু সমস্যার কারণে দেখা দেয়। যখন রক্তে বিলিরুবিন নামক হলুদ রঙের একটি পদার্থের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, তখন ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং শরীরের অন্যান্য টিস্যু হলুদাভ হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই জন্ডিস বলা হয়।
বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশেও এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে ভাইরাল হেপাটাইটিস, লিভারের সংক্রমণ, পিত্তনালীর বাধা এবং কিছু রক্তজনিত রোগের কারণে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা না হলে এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই জন্ডিসের লক্ষণ, কারণ, প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জন্ডিস কী
মানবদেহে লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cell) নির্দিষ্ট সময় পর ভেঙে যায় এবং এর ফলে বিলিরুবিন উৎপন্ন হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় লিভার এই বিলিরুবিনকে প্রক্রিয়াজাত করে পিত্তের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু কোনো কারণে লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হলে অথবা বিলিরুবিনের উৎপাদন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে রক্তে বিলিরুবিন জমা হতে থাকে। ফলে ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যায়, যা জন্ডিসের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আরো পড়ুন: থাইরয়েডের কারণে নারীদের গর্ভধারণের জন্য কি কি সমস্যা হতে পারে
জন্ডিসের প্রধান কারণ
জন্ডিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে। সাধারণত কারণগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।
১. লিভারের পূর্ববর্তী কারণ (Pre-hepatic Causes)
এক্ষেত্রে লিভারের সমস্যা না থাকলেও অতিরিক্ত রক্তকণিকা ধ্বংস হওয়ার কারণে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়।
কারণগুলো হলো:
- ম্যালেরিয়া
- থ্যালাসেমিয়া
- সিকেল সেল অ্যানিমিয়া
- হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া
২. লিভারজনিত কারণ (Hepatic Causes)
এগুলো সরাসরি লিভারের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রধান কারণ:
- হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই ভাইরাস
- লিভার সিরোসিস
- ফ্যাটি লিভার
- অতিরিক্ত মদ্যপান
- লিভার ক্যান্সার
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
৩. লিভারের পরবর্তী কারণ (Post-hepatic Causes)
পিত্তনালীতে বাধা সৃষ্টি হলে বিলিরুবিন শরীর থেকে বের হতে পারে না।
উদাহরণ:
- পিত্তথলির পাথর
- পিত্তনালীর টিউমার
- অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার
- পিত্তনালীর প্রদাহ
জন্ডিস রোগের লক্ষণ
জন্ডিসের লক্ষণ রোগের কারণ এবং তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
১. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
এটি জন্ডিসের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ। প্রথমে চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়, পরে ত্বকেও হলুদাভ ভাব দেখা যায়।
২. গাঢ় রঙের প্রস্রাব
জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাব সাধারণত গাঢ় হলুদ বা চায়ের মতো রঙের হয়ে যায়। এটি বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটে।
৩. মল ফ্যাকাশে বা সাদা রঙের হওয়া
পিত্তরসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে মলের স্বাভাবিক বাদামি রঙ পরিবর্তিত হয়ে ফ্যাকাশে বা সাদা হতে পারে।
৪. ক্ষুধামন্দা
অনেক রোগীর খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখা যায় এবং খাবারের স্বাদও কমে যায়।
বিশেষ করে ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত জন্ডিসে এই লক্ষণ বেশি দেখা যায়।
৬. দুর্বলতা ও ক্লান্তি
জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং দৈনন্দিন কাজ করতে কষ্ট অনুভব করেন।
৭. জ্বর
ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে জ্বর একটি সাধারণ লক্ষণ।
৮. পেটে ব্যথা
বিশেষ করে ডান পাশের উপরের অংশে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
৯. ত্বকে চুলকানি
পিত্তরস জমে গেলে ত্বকে তীব্র চুলকানি হতে পারে।
১০. ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘদিন জন্ডিস থাকলে রোগীর ওজন কমে যেতে পারে।
আরো পড়ুন: শিশুদের হাম প্রতিরোধে করণীয় কি
নবজাতকের জন্ডিস
জন্মের পর অনেক শিশুর শরীরে সাময়িক জন্ডিস দেখা যায়। একে নবজাতক জন্ডিস বলা হয়।
কারণ
- শিশুর লিভার পুরোপুরি পরিপক্ক না হওয়া
- রক্তের গ্রুপের অসামঞ্জস্য
- অকাল জন্ম
- ত্বক হলুদ হওয়া
- শিশুর অতিরিক্ত ঘুম
- দুধ কম খাওয়া
- পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো
- প্রয়োজনে ফটোথেরাপি
- জটিল ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা
জন্ডিস নির্ণয়ের উপায়
জন্ডিসের সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করে থাকেন।
রক্ত পরীক্ষা
- Serum Bilirubin Test
- Liver Function Test (LFT)
- Complete Blood Count (CBC)
ভাইরাল মার্কার পরীক্ষা
- HBsAg
- Anti-HCV
- HAV IgM
আল্ট্রাসনোগ্রাম
লিভার, পিত্তথলি এবং পিত্তনালীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য করা হয়।
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই
জটিল ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
জন্ডিসের প্রতিকারের উপায়
জন্ডিসের চিকিৎসা মূলত এর কারণের ওপর নির্ভর করে। কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ দিয়ে সব ধরনের জন্ডিস সারানো যায় না।
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম
জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীর শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. প্রচুর পানি পান
পর্যাপ্ত পানি শরীরকে ডিহাইড্রেশন থেকে রক্ষা করে এবং লিভারের কার্যক্রমকে সহায়তা করে।
৩. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত।
খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন:
- ভাত
- ডাল
- শাকসবজি
- ফলমূল
- মাছ
- পর্যাপ্ত তরল খাবার
৪. চর্বিযুক্ত খাবার এড়ানো
অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এড়িয়ে চলুন:
- ফাস্টফুড
- ভাজাপোড়া খাবার
- অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন
ভাইরাল হেপাটাইটিস, সংক্রমণ বা অন্যান্য কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ নির্ধারণ করেন।
৬. অ্যালকোহল সম্পূর্ণ পরিহার
মদ্যপান লিভারের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
৭. নিয়মিত ফলো-আপ
রক্তে বিলিরুবিন ও লিভারের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
জন্ডিস প্রতিরোধের উপায়
জন্ডিস প্রতিরোধে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা খুবই কার্যকর।
নিরাপদ পানি পান
দূষিত পানি হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসের প্রধান উৎস।
করণীয়
- ফুটানো পানি পান করা
- বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
- খাবার ঢেকে রাখা
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- খাওয়ার আগে হাত ধোয়া
- টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- পরিষ্কার পরিবেশে বসবাস করা
টিকা গ্রহণ
হেপাটাইটিস এ এবং বি প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর।
নিরাপদ রক্ত গ্রহণ
রক্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই রক্তের স্ক্রিনিং নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার
একই সিরিঞ্জ বা সূঁচ একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয়।
নিরাপদ যৌন আচরণ
হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণ প্রতিরোধে নিরাপদ যৌন আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
আরো পড়ুন: শরীরে রক্ত বৃদ্ধির জন্য কি কি ধরনের খাবার খাওয়া উচিত
জন্ডিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা
বাংলাদেশে জন্ডিস নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
ভুল ধারণা ১: আখের রস খেলে জন্ডিস ভালো হয়
বাস্তবে আখের রস জন্ডিসের চিকিৎসা নয়। বরং অপরিষ্কার আখের রস নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভুল ধারণা ২: হলুদ রঙের খাবার খাওয়া যাবে না
খাবারের রঙের সঙ্গে জন্ডিসের কোনো সম্পর্ক নেই।
ভুল ধারণা ৩: জন্ডিসে গোসল করা নিষেধ
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিয়মিত গোসল করা বরং উপকারী।
ভুল ধারণা ৪: কবিরাজি চিকিৎসায় জন্ডিস পুরোপুরি সেরে যায়
জন্ডিসের প্রকৃত কারণ নির্ণয় ছাড়া কোনো চিকিৎসাই নিরাপদ নয়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত:
- তীব্র জ্বর
- অচেতনতা
- শ্বাসকষ্ট
- রক্তবমি
- অতিরিক্ত পেট ফুলে যাওয়া
- তীব্র পেটব্যথা
- নবজাতকের জন্ডিস দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া
উপসংহার
জন্ডিস একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সংকেত, যা শরীরের ভেতরে লিভার, পিত্তথলি বা রক্তসংক্রান্ত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা এবং পেটব্যথা এর সাধারণ লক্ষণ। জন্ডিসের সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে এর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের ওপর। তাই কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং হেপাটাইটিসের টিকা গ্রহণের মাধ্যমে জন্ডিসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url