অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে মানবদেহের কি কি অঙ্গের ক্ষতিসাধন হতে পারে
আজ এই আর্টিকেলটিতে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে মানবদেহের কি কি অঙ্গের ক্ষতিসাধন হতে পারে সে সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ফোন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই মোবাইলের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ যদি অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় আমরা এসব ক্ষতির বিষয়টি বুঝতে পারি না বা গুরুত্ব দিই না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
নিম্নে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মানুষের মস্তিষ্কের ওপর। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে মস্তিষ্ক সবসময় উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। এর ফলে—
-
মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়
-
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে
-
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়
-
উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও হতাশা বৃদ্ধি পায়
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গেমে অতিরিক্ত আসক্তি মস্তিষ্কে ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা একপ্রকার মানসিক আসক্তিতে রূপ নেয়। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আরো পড়ুন: শিশুদের জন্য মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সমূহ
চোখের ক্ষতি
মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারে চোখে যেসব সমস্যা দেখা দেয়—
-
চোখে জ্বালা ও ব্যথা
-
চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
-
ঝাপসা দেখা
-
চোখ লাল হওয়া
-
দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হওয়া
এই সমস্যাগুলোকে একত্রে বলা হয় ডিজিটাল আই স্ট্রেইন। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ভবিষ্যতে স্থায়ী চোখের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কান ও শ্রবণশক্তির ক্ষতি
অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দে ইয়ারফোন বা হেডফোন ব্যবহার করেন। এর ফলে—
-
শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে যায়
-
কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ শোনা যায় (টিনিটাস)
-
কানের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে স্থায়ী বধিরতার কারণও হতে পারে।
ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডের ক্ষতি
মোবাইল ব্যবহার করার সময় বেশিরভাগ মানুষ ঘাড় নিচু করে দীর্ঘ সময় বসে থাকে। এর ফলে সৃষ্টি হয়
-
ঘাড় ব্যথা বা “টেক্সট নেক” সমস্যা
-
কাঁধ ও পিঠে ব্যথা
-
মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়া
-
দীর্ঘমেয়াদে ডিস্ক সমস্যা
এই সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে ক্রনিক ব্যথায় পরিণত হতে পারে, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
হাত কবজি ও আঙুলের ক্ষতি
মোবাইল টাইপিং ও স্ক্রলিংয়ের কারণে হাত ও আঙুলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে—
-
আঙুল ও কব্জিতে ব্যথা
-
ঝিনঝিন অনুভূতি
-
কার্পাল টানেল সিনড্রোমের ঝুঁকি
-
হাতের গ্রিপ শক্তি কমে যাওয়া
এই সমস্যা বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় গেম খেলে বা মোবাইলে কাজ করে তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
আরো পড়ুন: মানুষের প্রধান প্রধান হরমোন জনিত রোগের লক্ষণ সমূহ
হৃদযন্ত্র ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে মানুষ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে—
-
ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতা
-
হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
-
ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা
-
রক্তচাপ বৃদ্ধি
মোবাইলে আসক্ত মানুষ সাধারণত শরীরচর্চা ও খেলাধুলা থেকে দূরে থাকে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ঘুমের সমস্যা
মোবাইল ফোনের নীল আলো ঘুমের জন্য দায়ী মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে
-
ঘুম আসতে দেরি হয়
-
ঘুমের গভীরতা কমে যায়
-
অনিদ্রা দেখা দেয়
-
সকালে ক্লান্তি অনুভূত হয়
দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে তা মানসিক ও শারীরিক উভয় সমস্যার জন্ম দেয়।
মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার মানুষের সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—
-
পরিবার ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমে যায়
-
একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ে
-
বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে
-
আত্মবিশ্বাস কমে যায়
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তাদের সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
শিশু ও কিশোরদের উপর বিশেষ প্রভাব
শিশু ও কিশোরদের শরীর ও মস্তিষ্ক এখনও বিকাশমান অবস্থায় থাকে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে—
-
শেখার ক্ষমতা কমে যায়
-
আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়
-
চোখ ও মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে
-
শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
এ কারণে এই বয়সে মোবাইল ব্যবহারে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
উপসংহার
মোবাইল ফোন আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য উপকরণ হলেও এর অতিরিক্ত ও অযথা ব্যবহার মানবদেহের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মস্তিষ্ক, চোখ, কান, মেরুদণ্ড, হৃদযন্ত্র থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট। তাই আমাদের উচিত সচেতনভাবে মোবাইল ব্যবহার করা, প্রয়োজনের বাইরে দীর্ঘ সময় মোবাইলে আসক্ত না হওয়া এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়া।
***সঠিক ব্যবহারে মোবাইল হতে পারে উপকারী বন্ধু, আর অতিরিক্ত ব্যবহারে হয়ে উঠতে পারে নীরব ঘাতক। সচেতনতা ও সংযমই পারে আমাদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url