ঋতুভেদে ত্বকের যত্নে কোন ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত
ঋতুভেদে আমাদের ত্বকের আচরণ এবং চাহিদাও বদলে যায়। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ আর শীতের শুষ্কতাএকই ধরনের প্রসাধনী দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বছরের প্রতিটি সময় আপনার ত্বককে সতেজ ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রাখতে ঋতুভিত্তিক স্কিনকেয়ার গাইডলাইন নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
আমাদের চারপাশের আবহাওয়া ত্বকের আর্দ্রতা, তেল নিঃসরণ এবং স্থিতিস্থাপকতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনার বিউটি কেবিনেটের প্রসাধনীগুলোতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।
আরো পড়ুন: চুলের যত্নে সরিষার তেলের উপকারিতা সমূহ
গ্রীষ্মকাল: তেল নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা
গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং তাপে ত্বকের সেবাম গ্রন্থিগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ব্রণ এবং কালচে দাগের সমস্যা বেড়ে যায়।
- ক্লিনজার: এ সময় 'ফোমিং ক্লিনজার' বা জেল-বেসড ফেসওয়াশ ব্যবহার করা উচিত। এতে থাকা স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা টি-ট্রি অয়েল ত্বকের অতিরিক্ত তেল দূর করতে সাহায্য করে।
- টোনার: অ্যালকোহল-মুক্ত টোনার বা গোলাপ জল ব্যবহার করুন। এটি লোমকূপ সংকুচিত রাখতে এবং ত্বক ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করবে।
- সানস্ক্রিন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ): গ্রীষ্মে অন্তত SPF 50 যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন যা 'নন-কমেডোজেনিক' (যাতে লোমকূপ বন্ধ না হয়)। বাইরে যাওয়ার ২০ মিনিট আগে এটি লাগান।
- ময়েশ্চারাইজার: ভারী ক্রিমের বদলে হালকা 'ওয়াটার-বেসড' বা জেল ময়েশ্চারাইজার বেছে নিন।
বর্ষাকাল: সংক্রমণ রোধ ও পরিচ্ছন্নতা
বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলেও ত্বক অনেক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ সময় ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- এক্সফোলিয়েশন: সপ্তাহে দুইবার হালকা স্ক্রাব ব্যবহার করে মৃত কোষ পরিষ্কার করুন। এর ফলে ত্বকে ব্যাকটেরিয়া জমতে পারবে না।
- অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রসাধনী: এমন ক্লিনজার ব্যবহার করুন যাতে নিম, হলুদ বা অ্যালোভেরা আছে।
- হালকা সানস্ক্রিন: আকাশ মেঘলা থাকলেও আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করে। তাই জেল সানস্ক্রিন নিয়মিত ব্যবহার করুন।
- ক্লে মাস্ক: সপ্তাহে একদিন 'কওলিন ক্লে' বা 'বেন্টোনাইট ক্লে' মাস্ক ব্যবহার করলে রোমকূপের গভীরে থাকা ময়লা পরিষ্কার হয়।
শরৎ ও হেমন্ত: ট্রানজিশন পিরিয়ড
এই সময়ে আবহাওয়া না গরম, না খুব বেশি ঠান্ডা। এ সময় ত্বককে শীতের জন্য প্রস্তুত করতে হয়।
- হাইড্রেটিং সিরাম: আপনার রুটিনে হাইলুরোনিক অ্যাসিড (Hyaluronic Acid) যুক্ত সিরাম যোগ করুন। এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে স্পঞ্জের মতো কাজ করে।
- লিপ বাম: ঠোঁট ফাটা শুরু হওয়ার আগেই ভালো মানের শিয়া বাটার বা কোকো বাটার যুক্ত লিপ বাম ব্যবহার শুরু করুন।
- মাইল্ড ফেসওয়াশ: অতিরিক্ত কড়া ফেসওয়াশ ছেড়ে ক্রিমি টেক্সচারের ক্লিনজারের দিকে মনোনিবেশ করুন।
শীতকাল: গভীর আর্দ্রতা ও পুষ্টি
শীতের শুষ্ক বাতাস ত্বক থেকে স্বাভাবিক তেল কেড়ে নেয়, ফলে ত্বক ফেটে যায় এবং খসখসে হয়ে পড়ে।
- অয়েল-বেসড ক্লিনজার: ফোমিং ফেসওয়াশ ব্যবহার বন্ধ করে মিল্ক ক্লিনজার বা ক্লিনজিং বাম ব্যবহার করুন। এটি ত্বক পরিষ্কার করার পাশাপাশি আর্দ্রতা ফিরিয়ে দেয়।
- ভারী ময়েশ্চারাইজার: এ সময় সিরামাইড (Ceramides) বা গ্লিসারিন যুক্ত পুরু ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা জরুরি। এটি ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে।
- ফেস অয়েল: রাতে ঘুমানোর আগে আমন্ড অয়েল, আরগান অয়েল বা ভিটামিন-ই যুক্ত ফেস অয়েল ব্যবহার করলে ত্বক উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত থাকে।
- বডি বাটার: শুধু মুখে নয়, পুরো শরীরে ঘন বডি বাটার বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন।
সব ঋতুর জন্য কিছু গোল্ডেন রুলস
ঋতু যাই হোক না কেন, সুস্থ ত্বকের জন্য নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা অপরিহার্য:
- ডাবল ক্লিনজিং: দিনের শেষে মেকআপ এবং সানস্ক্রিন তুলতে প্রথমে অয়েল ক্লিনজার এবং পরে ওয়াটার ক্লিনজার ব্যবহার করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান: আর্দ্রতা কেবল বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও আসতে হয়। প্রতিদিন অন্তত ৩ লিটার পানি পান করুন।
- ভিটামিন-সি সিরাম: এটি ত্বককে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে এবং উজ্জ্বলতা বাড়ায়। সব ঋতুতেই এটি সকালে সানস্ক্রিনের নিচে ব্যবহার করা যেতে পারে।
- চোখের যত্ন: চোখের চারপাশের ত্বক খুব পাতলা হয়। তাই একটি ভালো আন্ডার-আই ক্রিম ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
উপসংহার
আপনার ত্বকের ধরন (তৈলাক্ত, শুষ্ক বা মিশ্র) বুঝে ঋতু অনুযায়ী প্রসাধনী নির্বাচন করলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব। অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহারের চেয়ে অল্প কিন্তু কার্যকরী পণ্যের ওপর নজর দিন। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে ত্বকের বার্তাও বোঝার চেষ্টা করুন—যদি ত্বক টানটান লাগে তবে আর্দ্রতা বাড়ান, আর যদি খুব তেল চিটচিটে লাগে তবে ক্লিনজিংয়ে মনোযোগ দিন।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url