আরবি শাবান মাসের ফজিলত
আজ এই আর্টিকেলটিতে আরবি শাবান মাসের ফজিলত সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
এক: শাবানের পনের তারিখে পুরুষদের জন্য কবরস্থানে গিয়ে দোয়া ও ইসতিগফার পড়া মুসতাহাব এবং তা হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত
দুই: যদি কিচু সদকা-খয়রাত অথবা খাদ্য ইত্যাদি পাক করে দান করেন, তাহলে এতে দোষের কিছু নেই।
তিন: এই রাতে জাগ্রত থেকে জনসমক্ষেই হোক অথবা নির্জনেই হোক ইবাদত-বন্দেগী করা খুবই উত্তম। কিন্তু ইজতেমার প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া চাই।
চার: শাবানের পনের তারিখে রোজা রাখা মুসতাহাব এবং খুবই ফজিলতময়।
পাঁচ: শাবানের ২৯ তারিখে যদি চাঁদ দেখা না যায় তাহলে ৩০ তারিখে বেলা এগারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। এই খেয়ালে রোজা রাখা যে, যদি রমজান প্রমাণ হয়ে যায় তাহলে এই রোজা রমজানের রোজা বলে পরিগণিত হবে, অন্যথায় নফল হয়ে যাবে, তা মাকরূহ। এবিসয়ে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
ছয়: শাবানের চাঁদকে খুব গুরুত্বসহকারে দেখা এবং এর তারিখকে রমজানুল মুবারকের জন্য বিশেষভাবে স্মরণ রাখার হুকুম হাদিসে শরিফে এসেছে।
সাত: শবে বরাতে বিশেষভাবে হালওয়া পাকানো এবং একে শরিয়তের হুকুম মনে করা দীনের মাঝে বৃদ্ধি করা হয়। তাই তা বিদআত।
আট: এই হালওয়া সম্পর্কে কোন কোন মানুষেরা ধারণা এই যে, প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দান্দান মুবারক যখন শহীদ হয়েছিল তখন তিনি হালওয়া খেয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলে থাকে যে, হযরত আমীরে হামযা (রাযি.)-এর শাহাদত এই দিনে হয়েছিল। এটা তাঁর ফাতেহা। এসবই ভিত্তিহীন। এই দু'টি ঘটনার উভয়টিই শাওয়ালের।
আরো পড়ুন: আরবি সফর মাসের ফজিলত সর্ম্পকে আলোচনা
নয়: কোন কোন মানুষ মনে করে যে, শবে বরাতের পূর্বে যদি কেউ মারা যায়, আর শবে বরাতে তাঁর ফাতেহা না দেওয়া হয়, তাহলে সে মৃতদের মধ্যেই গণ্য হবে না। এগুলো সম্পূর্ণই ভুল ধারণা। এসব ধারণার কোন ভিত্তি নেই।
দশ: কোন কোন মানুষ এই দিনে মশুরীর ডাল অবশ্যই পাকায় এবং তা জরুরী মনে করে। এটাও ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত ধারণা।
এগারো: আতশবাজী যে কোন সময় করাই শরিয়ত বিরোধী কাজ। বিশেষ করে এই রাতে করা মারাত্মক গুনাহ।
বারো: আতশবাজী করার জন্য সন্তানদেরকে টাকা-পয়সা দেওয়া, অথবা তাদের জন্য কেনা অথবা এ বিষয়ে কোন ধরনের সহযোগিতা করা সম্পূর্ণ না জায়েয।
তেরো: চৌদ্দ শাবানের তারিখকে তিহওয়ার মানানো এবং ঈদুল আযহার ঈদের ন্যায় বাচ্চাদেরকে কাপড় পরানো এবং ঈদী দেওয়া সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
চৌদ্দ: মকতবের শিক্ষকদেরকে এই দিনে ঈদের ন্যায় ছুটি না দেওয়া উচিত।
পনেরো: এই রাতে পাত্র পরিবর্তন করা, ঘর লেপা এবং বাতির আলোকে বিশেষভাবে জ্বালিয়ে আলো বাড়ানো ভিত্তিহীন। এসব কিছু পরিহার করা চাই।
শাবানের ফজিলত
এক: হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, শাবান আমার মাস। (দাইলামী)
দুই: হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মাসে বেশী বেশী রোজা রাখতেন। (শাইখাইন, মুওয়াত্তা, আবু দাউদ)
তিন: হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, শাবান হচ্ছে রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস। এতে বান্দাদের আমলসমূহ পেশ করা হয়।
শাবানের ১৫ তারিখের রোজা
হযরত আলী (রাযি.) বর্ণনা করেন যে, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- শাবানের ১৫ তারিখের রাত্রিতে আল্লাহ তা'আলার দরবারে নফল পড় এবং সেদিন রোজা রাখ। কেননা, এ রাত্রিতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দ্যুতি ও রহমত প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন- মাগফেরাত ও বখশিশ চাওয়ার মত কেউ আছে কি? আমি তার মাগফেরাতের ফয়সালা করব। রোজী চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তার রোজীর ফায়সালা করব। নিরাপত্তার আবেদন করে এমন কোন বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে নিরাপত্তা দান করব। এমনিভাবে বিভিন্ন বিষয়ে অভাবগ্রস্ত দেরকে আল্লাহ তা'আলা ডাকেন এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের প্রার্থিত বিষয় দান করেন। সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার রহমত এমনিভাবে মানুষকে এরাত্রিতে ডাকতে থাকে। [ইবনে মাজাহ, মাআরেফ, ওসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সা.]
আরো পড়ুন: আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করার সহজ পদ্ধতি
শবে বরাতের ফাজায়িল ও ইবাদত
এক: হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শাবানের মধ্যভাগে আসমানকে দুনিয়ার দিকে অবতরণ করান এবং সকল গুনাহগারদেরকে (অর্থাৎ যেসব গুনাহগারেরা মাফ চায় তাদেরকে) মাফ করেন। তবে মাফ করেন না মুশরিককে এবং মুনাফিকদেরকে অর্থাৎ যাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ আছে, তাদেরকে। (বাইহাকী শরিফ)
আওযায়ীতে 'মাশাহীনের' ব্যাখ্যা এই করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি বিদআতী এবং হকের জামাত থেকে দূরে অবস্থান করে। একখানা রেওয়ায়েতে ঐ সব লোকদেরকেও পৃথক করা হয়েছে, যারা জুলুম বা অন্যায়ভাবে উপার্জন করে।
জাদুকর- গায়েবের খবর যে বলে দেয়। যেমন আজকাল ফালনামা ওয়ালারা, বিভিন্ন ভণ্ডপীরেরা ও ফকীরেরা করে থাকে।
আরীফ- অর্থাৎ হাতের রেখা ও অন্যান্য নিদর্শনাবলী দেখে যারা কথা বলে।
জাবী- অর্থাৎ যে কর্তা ব্যক্তিকে নাজায়েয পদ্ধতিতে আয়ের জন্য বলে। উদ্বুদ্ধ করে।
কুবা- অর্থাৎ তুবাল অথবা পুরুষ দাওয়ালা।
উরতুবা- অর্থাৎ তাম্বুরওয়ালা (নওফেল আন আলী।)
অন্য এক বর্ণনায় আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তিকেও ইসতিছনা বা পৃথক করা হয়েছে। (সাঈদ বিন মানসুর)
অন্য এক বর্ণনায় তাদেরকেও ইসতিছনা করা হয়েছে, যারা টাখনুর নিচে লুঙ্গী বা পায়জামা পরিধান করে। মাতা-পিতাকে কষ্ট দেয়। সর্বদা মদ পান করে। (বাইহাকী শরিফ)
উল্লেখ্য: এটা হচ্ছে অতি বেশী খারাপ। তাছাড়া একবার মদপান করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ফাসেক হয়ে যাবে। হয়ে যাবে ঘৃণ্য।
দুই: হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শাবানের মধ্যভাগের রাতে ইবাদত কর। এর সকালে রোজা রাখ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূর্যাস্তের পরপরই দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে ইরশাদ করেন যে, আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী যে আমি তাকে মাফ করব? আছে কি কোন রিযিক তালাশকারী যাকে আমি রিযিক দান করব? আছে কি কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি, যাকে আমি বিপদ থেকে উদ্ধার করব? আছে কি এমন কেউ, আছে? এভাবে একসময় ফজর হয়ে যায়। (ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)
তিন: হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, এই রাতে আখলীন এবং রোযীন এবং যাদের হজ করার তাওফীক হবে, সবই লিখে রাখা হবে। (বাইহাকী শরিফ)
চার: হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন যে, এক রাতে আমি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাশে পেলাম না। তাই তাঁর খুঁজে বের হলাম। গিয়ে পেলাম তাকে জান্নাতুল বাকী'তে (মদীবার কবরস্থান।) তিনি বলেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই রাতে (শবে বরাতে) দুনিযার আসমানে অবতরণ করেন এবং কালর গোত্রের বকরীগুলোর চুল পরিমাণের চেয়েও বেশী মানুষকে মাফ করে থাকেন। (ইবনে আবী শাইব, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)
পাঁচ: হযরত আতা বিন ইয়াসার (রহ.) বলেন যে, শাবানের মধ্যভাগের রাতে অর্থাৎ শবে বরাতে মালাকুল মাওত (মৃত্যু দানকারী ফেরেশতা) এর হাতে একটা পারচা দেওয়া হয় এবং হুকুম করা হয় যে, যাদের নাম এই পারচায় লেখা আছে, এই বছরে তাদের মৃত্যু হবে। তো দেখা যায় যে, কোন ব্যক্তি হয়তো গাছ রোপন করছে, প্রায় কুড়িটার মতো বিয়ে করেছে, ঘর-বাড়ী নির্মাণ করছে, অথচ তারই নাম এ পারচায় মৃতদের তালিকায় লেখা হয়েছে। (ইবনে আবিদ্দুনিয়া)
এই মাসের কিছু কুসংস্কার
বেশী করে বাতি জ্বালানো। খেলা-ধুলার জন্য সমবেত হওয়া আতশবাজী করা। মনে হয় এসব হিন্দুদের থেকে আমাদের মুসলমান সমাজ গ্রহণ করেছে। হযরত আলী ইবনে ইবরাহীম (রহ.) বলেন যে, বেশী বেশী আরোকসজ্জা করাটা মূলত মক্কা থেকে শুরু হয়েছে। এর প্রকৃতপক্ষে অগ্নি উপাসক ছিল। ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা এই কুপ্রথাটি ইসলামের মাঝেও দীক্ষিত করলো যে, মুসলমানদের সাথে নামায আদায়কালে আগুনকেও সেজদা করা যায়। আইয়িম্মায়ে কেরামগণ এই কুসংস্কারকে রহিত করেছেন। অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে মিসর ও শামে এই কুপ্রথা সমূলে উৎপাটন করা হয়। (এটা কোন আশ্চর্যের কথা নয় যে আজকের এই আতশবাজীও এরই একটা অংশ।)
কোন কোন হাদিস থেকে জানা যায় যে, শাবানের মধ্যভাগের পরে অর্থাৎ শবে বরাতের পরে রোজা রাখা যাবে না। -এটা তাদের জন্য, যাদের বিষয়ে সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাহলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। রমজানের রোজা অপারগ হয়ে অনাকর্ষণের সাথে রাখবে বা হয়তো রাখবেই না, তাদের জন্যে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url