বিটফল খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
বিটফল বা বিটরুট (Beetroot) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি 'সুপারফুড' হিসেবে পরিচিত। এর উজ্জ্বল লাল রং এবং চমৎকার পুষ্টিগুণ একে অনন্য করে তুলেছে। প্রাচীনকালে কেবল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পুষ্টিবিদরা এখন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিট রাখার পরামর্শ দেন।
নিচে বিটফল খাওয়ার উপকারিতা, অপকারিতা এবং সঠিক নিয়ম নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. বিটফলের পুষ্টিগুণ (Nutritional Value)
বিটফল পুষ্টির একটি খনি। প্রতি ১০০ গ্রাম বিটফলে সাধারণত নিচের উপাদানগুলো থাকে:
- ক্যালোরি: ৪৩-৪৫ কি.ক্যালোরি
- পানি: ৮৭-৮৮%
- প্রোটিন: ১.৬ গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট: ৯.৬ গ্রাম
- ফাইবার: ২.৮ গ্রাম
- ফ্যাট: ০.২ গ্রাম
- ভিটামিন ও খনিজ: ভিটামিন C, ভিটামিন B6, ফোলেট (B9), ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ এবং আয়রন।
২. বিটফল খাওয়ার বিস্ময়কর উপকারিতা
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী
বিটে উচ্চমাত্রায় ডায়েটারি নাইট্রেট থাকে। শরীর এই নাইট্রেটকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত করে, যা রক্তনালীগুলোকে শিথিল ও প্রসারিত করে। ফলে রক্ত চলাচল সহজ হয় এবং উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত হ্রাস পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এক গ্লাস বিটের রস পান করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
হৃদরোগের অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তনালীতে প্রদাহ। বিটের নাইট্রেট এবং পটাশিয়াম হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এটি ধমনীর কার্যকারিতা সচল রাখতে সাহায্য করে।
অ্যাথলেটিক পারফরম্যান্স বা শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি
খেলোয়াড়দের জন্য বিটের রস একটি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক। এটি মাইটোকন্ড্রিয়ার (কোষের শক্তিঘর) কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে, ফলে শরীর অক্সিজেন আরও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারে। এটি দীর্ঘক্ষণ কঠোর পরিশ্রম বা ব্যায়াম করার ক্ষমতা বাড়ায়।
হজমশক্তি উন্নত করে
বিটে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে। ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত বিট খেলে কোলন ক্যানসার এবং পাচনতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
লিভার ডিটক্সিফিকেশন
বিটে থাকা বেটেইন (Betaine) নামক উপাদান লিভারে ফ্যাট জমতে বাধা দেয় এবং লিভার থেকে বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন) বের করে দিতে সাহায্য করে। যারা ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য বিট খুবই উপকারী।
মস্তিষ্ক সচল রাখে
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, যা স্মৃতিশক্তি লোপ বা ডিমেনশিয়ার কারণ হতে পারে। বিটের নাইট্রেট মস্তিষ্কের সামনের অংশে রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়ে চিন্তা করার শক্তি এবং স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ রাখে।
রক্তশূন্যতা (Anemia) দূর করে
বিটে প্রচুর আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড রয়েছে, যা লোহিত রক্তকণিকা (RBC) তৈরিতে অপরিহার্য। অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য বিট একটি জাদুকরী সবজি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
এতে থাকা ভিটামিন C এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং কোষের ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।
৩. বিটফলের অপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যেকোনো ভালো জিনিসেরই অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে। বিটের ক্ষেত্রেও কিছু সতর্কতা জরুরি:
- বিচুরিয়া (Beeturia): বিট খাওয়ার পর প্রস্রাব বা মল লালচে বা গোলাপী রঙের হতে পারে। এটি দেখে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, তবে অতিরিক্ত বিট খাওয়ার কারণে এটি হতে পারে।
- কিডনি স্টোন: বিটে প্রচুর পরিমাণে অক্সালেট (Oxalate) থাকে। যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা আছে, তাদের অতিরিক্ত বিট খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।
- রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়া: যারা আগে থেকেই নিম্ন রক্তচাপের (Low BP) ওষুধ খাচ্ছেন, তারা বিট খাওয়ার আগে সাবধান থাকুন, কারণ এটি রক্তচাপ আরও কমিয়ে দিতে পারে।
- পেটের সমস্যা: যাদের হজমশক্তি খুব দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিট বা বিটের রস পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া বা পেটে ব্যথার কারণ হতে পারে।
- গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে: অল্প পরিমাণে বিট উপকারী হলেও অতিরিক্ত নাইট্রেট ভ্রূণের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় পরিমিত সেবন করা উচিত।
৪. বিটফল খাওয়ার সঠিক নিয়ম
বিটফল সর্বোচ্চ উপকার পেতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলা ভালো:
১. জুস হিসেবে: কাঁচা বিট, গাজর এবং আদা মিশিয়ে জুস তৈরি করে পান করা সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি।
২. সালাদ হিসেবে: পাতলা করে স্লাইস করে বা কুচি করে লেবুর রস মিশিয়ে সালাদে খেতে পারেন।
৩. রান্না করে: তবে মনে রাখবেন, খুব বেশি সেদ্ধ করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। হালকা ভাপে বা রোস্ট করে খাওয়া ভালো।
৪. বিটের পাতা: বিটের পাতাও কিন্তু অত্যন্ত পুষ্টিকর। এটি শাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায়।
৫. উপসংহার
বিটফল প্রাকৃতিক পুষ্টির এক বিস্ময়কর উৎস। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানো পর্যন্ত এর বহুমুখী গুণাগুণ রয়েছে। তবে যাদের কিডনিতে পাথরের সমস্যা রয়েছে, তাদের একটু সচেতন থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে, সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাবারে পরিমিত বিট রাখা একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত।
বিঃদ্রঃ কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ খেলে ডায়েটে বিট যুক্ত করার আগে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url