শিশুদের বেশি বেশি টেলিভিশন দেখার ক্ষতিকর দিক সমূহ
শিশুদের অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ক্ষতিকর দিক নিয়ে একটি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো। এই আর্টিকেলটিতে শারীরিক, মানসিক, এবং সামাজিক—সব ধরনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে টেলিভিশন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কার্টুন বা বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রাম অত্যন্ত জনপ্রিয়। কর্মব্যস্ত অভিভাবকরা অনেক সময় শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাবার খাওয়ানোর সময় টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে দেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। নিচে শিশুদের অতিরিক্ত টিভি দেখার ক্ষতিকর দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
আরো পড়ুন:
শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
শিশুদের বৃদ্ধির সময় তাদের শারীরিক সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ টিভি দেখার ফলে তাদের শারীরিক কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটে।
- স্থূলতা বা ওবেসিটি (Obesity): অতিরিক্ত টিভি দেখার সবচেয়ে বড় কুফল হলো ওজন বৃদ্ধি। যখন শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভির সামনে বসে থাকে, তখন তাদের ক্যালোরি বার্ন হয় না। এছাড়া টিভি দেখার সময় জাঙ্ক ফুড বা চিপস খাওয়ার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এই অলস জীবনযাপন এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস 'চাইল্ডহুড ওবেসিটি'র প্রধান কারণ।
- দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে। একে 'ডিজিটাল আই স্ট্রেইন' বলা হয়। এর ফলে চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ জ্বালাপোড়া করা, ঝাপসা দেখা এবং অল্প বয়সেই ভারী পাওয়ারের চশমা ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।
- ঘুমের ব্যাঘাত: টিভির স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) শিশুদের ঘুমের হরমোন 'মেলাটোনিন'-এর নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, দেরি করে ঘুমানো বা ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখার মতো সমস্যা তৈরি হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।
- শারীরিক গঠন ও ব্যথা: দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে টিভি দেখার ফলে ঘাড়, পিঠ ও কোমরে ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে। এটি শিশুদের মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাধা
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য সক্রিয় খেলাধুলা, চিন্তাভাবনা এবং ইন্টারঅ্যাকশন প্রয়োজন। টিভি দেখা একটি 'প্যাসিভ' বা নিষ্ক্রিয় কাজ, যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়।
- মনোযোগের ঘাটতি (Attention Deficit): গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু খুব অল্প বয়স থেকে অতিরিক্ত টিভি দেখে, পরবর্তী জীবনে তাদের মনোযোগের অভাব বা 'অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার' (ADHD)-এর ঝুঁকি বাড়ে। টিভিতে দৃশ্যগুলো খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যা বাস্তব জীবনের ধীরগতির সাথে খাপ খাওয়াতে তাদের সমস্যা তৈরি করে।
- ভাষাগত দক্ষতা কমে যাওয়া: শিশুরা কথোপকথনের মাধ্যমে ভাষা শেখে। টিভি কথা বলে, কিন্তু উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না। ফলে দ্বিমুখী যোগাযোগ (Two-way communication) হয় না। এতে শিশুর শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি পায় না এবং কথা বলা শিখতে দেরি হতে পারে।
- সৃজনশীলতা হ্রাস: খেলাধুলার সময় শিশুরা নিজেরা গল্প তৈরি করে, যা তাদের কল্পনাশক্তি বাড়ায়। কিন্তু টিভি দেখার সময় তাদের সবকিছু তৈরি করে দেওয়া হয়, ফলে তাদের নিজস্ব কল্পনাশক্তি বা সৃজনশীলতা ব্যবহারের সুযোগ থাকে না।
আচরণগত পরিবর্তন ও আগ্রাসন
টেলিভিশনের বিষয়বস্তু শিশুর আচরণে গভীর ছাপ ফেলে। শিশুরা যা দেখে, তাই অনুকরণ করার চেষ্টা করে।
- আগ্রাসী মনোভাব (Aggression): অনেক কার্টুন বা মুভিতে মারামারি, সহিংসতা এবং ঝগড়া দেখানো হয়। শিশুরা মনে করে সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হলো শক্তি প্রয়োগ করা। এর ফলে তারা সহপাঠী বা ভাই-বোদের সাথে আগ্রাসী আচরণ করতে শুরু করে।
- ভয়ভীতি ও উদ্বেগ: হরর মুভি, ভুতুড়ে কার্টুন বা হিংসাত্মক সংবাদ দেখে শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের সৃষ্টি হতে পারে। এটি তাদের মধ্যে অকারণে উদ্বেগ বা 'অ্যাজাইটি' তৈরি করে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
- বাস্তবতা ও কল্পনার মিশ্রণ: খুব ছোট শিশুরা ফ্যান্টাসি এবং বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তারা সুপারহিরোদের মতো উড়তে বা লাফ দিতে গিয়ে অনেক সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়।
সামাজিক দক্ষতার অবক্ষয়
মানুষ সামাজিক জীব, এবং ছোটবেলা থেকেই সামাজিকীকরণের পাঠ শুরু হয়। কিন্তু অতিরিক্ত টিভি আসক্তি শিশুকে অসামাজিক করে তুলতে পারে।
- সামাজিক মেলামেশায় অনীহা: যে সময়টা শিশুর বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলার কথা, সে সময়টা তারা টিভির সামনে কাটাচ্ছে। ফলে অন্যদের সাথে মেশা, বন্ধুত্ব করা, বা দলে কাজ করার (Teamwork) দক্ষতা তাদের মধ্যে তৈরি হয় না।
- সহানুভূতির অভাব: অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) কমিয়ে দেয়। তারা মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বা আবেগের ভাষা বুঝতে পারে না, ফলে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা বা সহানুভূতির অভাব দেখা দিতে পারে।
শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব
স্কুলগামী শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টিভি দেখা সরাসরি তাদের রেজাল্টের ওপর প্রভাব ফেলে।
- পড়াশোনায় অমনোযোগ: টিভি দেখার নেশায় শিশুরা হোমওয়ার্ক বা পড়ার সময় কমিয়ে দেয়। এছাড়া টিভিতে দেখা বিষয়গুলো তাদের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, ফলে পড়ার টেবিলে মনোযোগ বসানো কঠিন হয়ে পড়ে।
- বই পড়ার অভ্যাস নষ্ট হওয়া: টিভি দেখা খুব সহজ বিনোদন, যেখানে মস্তিষ্কের খাটুনি নেই। অন্যদিকে বই পড়ার জন্য ধৈর্য ও মনোযোগ লাগে। টিভিতে অভ্যস্ত শিশুরা বই পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বিজ্ঞাপনের কুপ্রভাব (Consumerism)
টেলিভিশনে শিশুদের লক্ষ্য করে প্রচুর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। চকোলেট, চিপস, খেলনা বা ভিডিও গেমের এসব লোভনীয় বিজ্ঞাপন শিশুদের মধ্যে ভোগবাদী মানসিকতা তৈরি করে।
- জেদ ও নাছোড়বান্দা স্বভাব: বিজ্ঞাপনে দেখা জিনিসটি পেতেই হবে—এমন জেদ শিশুরা ধরে বসে। একে 'পেস্টার পাওয়ার' (Pester Power) বলা হয়। এটি পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।
প্রতিকার: অভিভাবকদের করণীয় কী?
টেলিভিশন মানেই খারাপ নয়, সমস্যা হলো এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। শিশুদের এই ক্ষতি থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে:
১. সময় নির্ধারণ: আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস-এর মতে, ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিভি বা স্ক্রিন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা উচিত। ২-৫ বছর বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা এবং বড়দের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে হবে।
২. মানসম্মত কন্টেন্ট: শিশু কী দেখছে তা মনিটর করুন। শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, যেমন—পশু-পাখি চেনা, বিজ্ঞান বা গণিতের মজার কার্টুন দেখতে উৎসাহিত করুন।
৩. একসাথে দেখা (Co-viewing): শিশুকে একা টিভি দেখতে না দিয়ে আপনিও সাথে বসুন। অনুষ্ঠানে কী ঘটছে তা নিয়ে শিশুর সাথে আলোচনা করুন। এতে এটি একটি ইন্টারেক্টিভ সেশনে পরিণত হবে।
৪. বিকল্প বিনোদন: শিশুকে মাঠে খেলতে নিয়ে যান, ছবি আঁকতে দিন বা গল্পের বই পড়ে শোনান। টিভির চেয়ে মজার কোনো বিকল্প পেলে তারা এমনিতেই টিভি থেকে সরে আসবে।
৫. বেডরুমে টিভি নয়: শিশুর শোবার ঘরে বা পড়ার ঘরে কখনোই টেলিভিশন রাখবেন না। খাওয়ার সময় টিভি বন্ধ রাখার নিয়ম চালু করুন।
উপসংহার
শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দায়িত্ব আমাদেরই। টেলিভিশন বিনোদনের একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু একে শিশুর জীবনের একমাত্র আনন্দ হতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো অনুধাবন করে, আজ থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং অভিভাবকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানই পারে শিশুকে একটি সুস্থ ও সুন্দর শৈশব উপহার দিতে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url