জিন্নাহ্ দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলন
জিন্নাহ্ দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলন, জিন্নাহ্ দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলন দ্বিজাতিতত্ত্ব কী তা বর্ণনা করতে পারবেন। পাকিস্তান আন্দোলনে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব
জাতিতত্ত্বের বিশ্লেষণে একটি জনগোষ্ঠীকে তখনই জাতি বলা যায়, যার ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, মনন, কৃষ্টি, ধর্ম এমনকি অর্থনীতি একটি একক সত্তায় পরিণত লাভ করে। তবে মুসলিম লীগ সভাপতি এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের হিন্দু ও মুসলমান এ দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এটিই মূলত জিন্নাহর 'দ্বিজাতিতত্ত্ব' বা Two Nations Theory'র মূলকথা।
তিনি ধর্মীয় দিককে প্রাধান্য দিয়েই তাঁর জাতিতত্ত্ব দাঁড় করান। ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবধারা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছিলেন "We maintain and hold that Muslim and Hindus are two major nations by any definition or text of a nation. We are nation of a hundred million and, what is more, we are a nation with our own distinctive culture and civilization, language and literature, art and architecture, customs, history and traditions, aptitudes and ambitions. In short. we have our own distinctive outlook on life and of life." অর্থাৎ "আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, জাতিতত্ত্বের যে-কোনো সংজ্ঞা বিচারে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি প্রধান ভিন্ন জাতি। ভারতের দশ কোটি মুসলমান জনগণ যাদের রয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও সভ্যতা, ভাষা ও সাহিত্য, শিল্পকলা ও স্থাপত্য, রীতিনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এক ও অভিন্ন জীবন পদ্ধতি।"
আরো পড়ুন: ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ও তার ফলাফল
পাকিস্তান আন্দোলনে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রভাব
জিন্নাহর 'দ্বিজাতিতত্ত্ব' ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাবের মূলভিত্তি। যদিও লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' কিংবা 'দ্বিজাতিতত্ত্বের' কথা উল্লেখ ছিল না।
ধর্ম এক হলেই এক জাতি হয় না-বাংলাদেশের অভ্যুদয় এর বড় প্রমাণ। তাই বলা চলে, জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল বিকৃত ও অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তকর তত্ত্ব। এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্টতত্ত্ব। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হিসেবে পরিচিত। জাতি গঠনে যে একই ভাষাভাষী, গোষ্ঠীভুক্ত ও রক্ত-সম্বন্ধের অধিকারী হতে হয় তাও নয়। ভারত, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, কানাডা এর উদাহরণ। জাতিসত্তা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর এক অভিন্ন ইতিবাচক সচেতনতা, একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বসবাসের ইচ্ছা এর প্রকাশিত রূপ।
জিন্নাহর 'দ্বিজাতিতত্ত্ব' বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর রচিত ছিল না। তা ছিল প্রধানত, অখন্ড ভারতে অনিবার্য হিন্দু এলিট গোষ্ঠী আধিপত্যের স্থলে ভারত বিভক্তি এবং আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ থেকে স্থায়ী পরিত্রাণের লক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ, কৃষ্টি, ভাষা, অঞ্চল ও ঐতিহ্যে বিভক্ত ভারতীয় মুসলমানদেরকে একই পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি ভিত্তি। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানদের প্রতি ইংরেজ সরকার সন্দিহান থাকে। মুসলমানরাও দীর্ঘসময় অসহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে। ফলে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে বা উপেক্ষিত থাকে। অবিভক্ত ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থায়ী অধিপত্যের ভীতি মুসলমানদেরকে শঙ্কিত করে তোলে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার গঠন, হিন্দু অধিপত্যের বহিঃ প্রকাশ প্রভৃতি ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রচন্ডভাবে ভাবিয়ে তোলে।
এমতাবস্থায় জিন্নাহ তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতের বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করলে তা ভারতীয় মুসলমানদের চেতনামূলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়। পৃথক আবাসভূমি বা স্বাধীনতার স্বপ্ন তাদেরকে জাগিয়ে তোলে। পাকিস্তান আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান ইস্যুতে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুল সাফল্য অর্জন করে। নির্বাচনোত্তর ব্রিটিশ সরকার ভারতে একটি মন্ত্রি মিশন প্রেরণ করে অত্যন্ত শিথিল বন্ধনীর মধ্যে ভারতকে অখন্ডিত রাখার সর্বশেষ চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল হয় নি। অবশেষে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়। প্রতিষ্ঠালাভ করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তান।
আরো পড়ুন: গবাদিপশুর অনধিকার প্রবেশ আইন ১৮৭১
সারকথা
'দ্বিজাতিতত্ত্বের' মূল কথা ছিল ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ই নয়, তারা দুটি পৃথক জাতি। অতএব, তাদের জন্য দুটি পৃথক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আবশ্যক। জিন্নাহর এই দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল পাকিস্তান প্রস্তাব বা ভারত বিভক্তির মূল ভিত্তি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) বা পাকিস্তান প্রস্তাবের কোথাও 'দ্বিজাতিতত্ত্ব' এই মর্মে উল্লেখ নেই। দ্বিজাতিতত্ত্বকে পাকিস্তান আন্দোলনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার একটি কৌশল বলে মনে করা হয়। ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় এর প্রভাব ছিল অপরিসীম।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url