শবে বরাতের ফজিলত সমূহ
শবে বরাত বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ (শাবান মাসের মধ্য রজনী) মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি রাত। ফারসি শব্দ ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ মানে মুক্তি বা ভাগ্য। অর্থাৎ শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত বা ভাগ্যের রজনী। এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং অগণিত মানুষকে ক্ষমা করে দেন।
নিচে শবে বরাতের গুরুত্ব, ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ তুলে ধরা হলো:
শবে বরাতের তাৎপর্য ও ফজিলত
ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শাবান মাস অত্যন্ত বরকতময়। এই মাসের ১৫তম রাতটিই হলো শবে বরাত। হাদিস শরিফে এই রাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে অধিক হারে রোজা রাখতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
১. ক্ষমা লাভের রাত
শবে বরাতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ক্ষমা লাভের রাত। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন:
"অর্ধ-শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।" (সহিহ ইবনে হিব্বান)
২. দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ
এই রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন। তিনি ঘোষণা করেন— "আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কেউ রিজিক অন্বেষণকারী? আমি তাকে রিজিক দান করব। আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে মুক্তি দেব।" এভাবে ফজর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা বান্দাদের অভাব পূরণের সুযোগ দেন।
৩. ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়ে মতামত
যদিও কুরআনুল কারিমের সুরা দুখানের আয়াতগুলো নিয়ে অনেক মুফাসসির ভিন্ন মত পোষণ করেছেন (অনেকে একে শবে কদর বলেছেন), তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) সহ অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীন মনে করেন, এই রাতে আগামী এক বছরের বাজেট বা মানুষের হায়াত, মউত ও রিজিকের ফয়সালা চূড়ান্ত করা হয়।
শবে বরাতে পালনীয় আমলসমূহ
শবে বরাতের কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত বা বিশেষ কোনো নামাজের নিয়ম কুরআন-সুন্নাহতে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে একজন মুমিন হিসেবে সওয়াব হাসিলের জন্য কিছু নফল ইবাদত করা যেতে পারে:
- নফল নামাজ: দীর্ঘ কিরাত এবং ধীরস্থিরভাবে নফল নামাজ পড়া। দুই দুই রাকাত করে আপনি যত ইচ্ছা নামাজ পড়তে পারেন।
- কুরআন তিলাওয়াত: এই বরকতময় রাতে সুরা ইয়াসিন, সুরা আর-রহমান বা কুরআনের যেকোনো অংশ তিলাওয়াত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
- তওবা ও ইস্তেগফার: বিগত দিনের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা এবং ভবিষ্যতে পাপ না করার অঙ্গীকার করা।
- জিকির ও দরুদ পাঠ: বেশি বেশি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা।
- পরদিন রোজা রাখা: শাবান মাসের ১৫ তারিখে (শবে বরাতের পরের দিন) নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের। হাদিস অনুসারে, আইয়ামে বিজের (চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা রাখার বিধানও এর সাথে মিলে যায়।
বর্জনীয় কাজ ও সামাজিক কুসংস্কার
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে কিছু ভুল প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে, যা পরিহার করা জরুরি:
- আতশবাজি ও পটকা ফোটানো: এটি সম্পূর্ণ হারাম ও অনৈসলামিক সংস্কৃতি। ইবাদতের রাতে হৈ-হুল্লোড় করা গুনাহের কাজ।
- হালুয়া-রুটির বাধ্যবাধকতা: শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবারের আয়োজন করাকে সওয়াবের অংশ মনে করা একটি কুসংস্কার। এটি সামাজিকভাবে করা যেতে পারে, তবে দ্বীনের অংশ মনে করা ভুল।
- ঘরবাড়ি আলোকসজ্জা: ইবাদতের রাতে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা করে অপচয় করা ঠিক নয়।
- কবরস্থানে অতিরিক্ত ভিড়: কবর জিয়ারত করা সুন্নাত, তবে একে উৎসবের রূপ দেওয়া বা সেখানে মেলা বসানো ইসলাম সমর্থন করে না।
উপসংহার
শবে বরাত হলো নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করার এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করার একটি সুবর্ণ সুযোগ। সারা রাত জেগে থেকেও যদি কারো মনে হিংসা থাকে বা সে যদি শিরকে লিপ্ত থাকে, তবে সে এই রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। তাই আমাদের উচিত যাবতীয় পাপাচার ও হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই পবিত্র রাতের ফজিলত নসিব করুন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করুন। আমিন।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url