ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য বা রূপরেখা
আজ এই আর্টিকেলটিতে ইসলামি অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলাচনা করা হলো।
ভূমিকা
ইসলাম মানব জাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ, শাশ্বত ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে। এ ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি ও ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের পার্থিব জগতে চলাফেরা, আদান-প্রদান, আয়-ব্যয় ইত্যাকার সকল দিক এর অন্তর্ভুক্ত। সূতরাং মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কিভাবে অর্থোপার্জন ও ব্যয়-বণ্টন এবং ভোগ-ব্যবহার করবে, কিভাবে তাদের জাতীয় অর্থনীতি সুসংগঠিত হবে, প্রভৃতি সকল দিকের নির্দেশনা ইসলামে রয়েছে।
এ অর্থ ব্যবস্থা বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক এ দুই চরম ব্যবস্থা থেকে আলাদা এক বিজ্ঞানসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থ ব্যবস্থা। এ অর্থ ব্যবস্থার কতিপয় মূলনীতি বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হল-
আরো পড়ুন: পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা রচনা সমূহ
ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বা রূপরেখা
ব্যক্তি মালিকানা: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত। উপার্জনের যাবতীয় বিধি-নিষেধ পালনের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করবে, উপার্জনকারী হিসেবে সে তার মালিক হবে। ইসলাম এটাই সমর্থন করে, যাতে তার উপার্জন স্পৃহা বৃদ্ধি পায়।
আয় বা উপার্জন পদ্ধতি: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় আয়ের সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থই মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয়, বরং চারিত্রিক উন্নতি ও পরকালীন মুক্তিই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। তাই অবৈধ উপায়ে উপার্জনকে ইসলাম নিষেধ করে। একমাত্র বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত পথেই অর্থোপার্জনের নির্দেশ রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন। "হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করো না।" (সূরা : আন-নিসা)
বণ্টন পদ্ধতি: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সম্পদে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখার পর সম্পদ যেন এককেন্দ্রিক না হয়, সে লক্ষ্যে সুষম বণ্টন নীতি প্রণয়ন করেছে। এর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে আল-কুরআন ঘোষণা করেছে, "সম্পদ যেন কেবল তোমাদের ধনীদের হাতে পুঞ্জিভূত হয়ে না থাকে।" (সূরা আল-হাশর: ৭)
সঞ্চয়ে নিষেধাজ্ঞা: মূল্য বৃদ্ধি ও অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে অধিক সম্পদ গচ্ছিত রাখা এবং যাকাত আদায় না করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার প্রতি ইসলামের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী, "যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করবে ও তার যাকাত আদায় করবে না, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির দুঃসংবাদ।" (সূরা আত-তাওবা)
অবৈধ উপার্জনে নিষেধাজ্ঞা: ইসলাম নাপাক ও হারাম বস্তুর ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তি, জবর-দখল এবং উৎকোচ গ্রহণ ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সুদ প্রথার উচ্ছেদ: পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূললক্ষ্য হচেছ সুদের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও পরোক্ষভাবে সুদ প্রথা চালু রেখেছে। ইসলামি ব্যবস্থায় সুদকে বিলুপ্ত করে ব্যবসা হালাল করা হয়েছে এবং যাকাত ও সাদাকাহর মাধ্যমে বিনা সুদে অর্থহীনদের সাহায্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সুদ প্রথা বিলুপ্ত করে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (আল কুরআন)
সম্পদের মালিকানা: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সম্পদের মালিক ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী নয়; বরং সম্পদের প্রকৃত মালিক হলেন আল্লাহ। মানুষ শুধু ভোগ, দখল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। সূতরাং ব্যক্তির ইচ্ছামত সম্পদ ব্যয় ও কুক্ষিগত করার সুযোগ নেই। এ মর্মে আল-কুরআন বলছে- "নিশ্চয়ই এ মহাবিশ্ব আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা এর কিছু অংশের মালিকানা দিয়ে থাকেন।"
( আল-কুরআন )
অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা: ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণ অর্থনৈতিক সাম্য বাস্তবায়ন শুধু জরুরি নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষেও তা একান্ত আবশ্যক। তাই ইসলাম ধন-সম্পদ বণ্টনের সুষ্ঠ ব্যবস্থা করে দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ জমা না করে নিঃস্ব ও অভাবীদের মাঝে তা বণ্টন করে দিতে বাধ্য করেছে।
সম্পদহীনদের অংশ পরিশোধ: মহান আল্লাহর সৃষ্ট জীব হিসেবে সকল মানুষেরই রিযিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। অথচ সম্পদ দান করেছেন কতিপয় বিশেষ ব্যক্তিকে। এতে বোঝা যায় যে, সম্পদ যার হাতেই থাকুক না কেন, তাতে সকলেরই অধিকার আছে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- "তোমাদের ধন-সম্পদের মধ্যে গবীর-মিসকীনদেরও হক আছে।" (আল-কুরআন)
তিনি আরো বলেছেন- "তাদের (গরীবদের) হককে শষ্য কর্তনের দিনই দিয়ে দাও।" (আল-কুরআন)
যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন: মানুষের অর্জিত সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ যাকাত হিসেবে প্রদান করা ইসলামের বিধান, যা ইসলামের বুনিয়াদের অন্যতম। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ পরিশুদ্ধ ও বর্ধিত হয়, যা অনাদায়ে কিয়ামতে কঠিন শাস্তির সংবাদ প্রদান করা হয়েছে। সূতরাং ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা প্রবর্তন।
ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় মৃত ব্যক্তির ঋণ, ওসিয়াত ও দাফন খরচের পর অবশিষ্ট সম্পদ বিধান মত তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টনের সুব্যবস্থা রয়েছে। যার ফলে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ ব্যয়-বণ্টনে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় না।
গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ব্যয়: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় জিহাদ বা যুদ্ধে প্রাপ্ত বিজিত সম্পদকে পাঁচ ভাগ করে-এর ৪ অংশ যোদ্ধাদের মাঝে এবং ১ অংশ জাতীয় সমাজকল্যাণকর কাজে ব্যয় করার নির্দেশ রয়েছে।
বায়তুল মাল গঠন: ইসলামি অর্থনীতিতে বায়তুল মাল বা সরকারি কোষাগার গঠনের নির্দেশ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি অংশ বায়তুল মালে জমা থাকবে। দেশের যে কোন নিরুপায় ব্যক্তি বা নিরাশ্রয়ের রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণ-পোষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এমনকি, মৃত ব্যক্তি যদি পরিবার নিয়ে বাঁচার তাগিদে ঋণ করে থাকে এবং পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে সে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত হবে। এমনিভাবে বিভিন্নমুখী প্রয়োজনের সময় আর্থিক সুবিধা বিধানের জন্য ইসলামি রাষ্ট্র বায়তুল মাল গঠন করে থাকে।
সুষ্ঠু শ্রমনীতি প্রবর্তন: ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সুষ্ঠু শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম সকল শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন করে থাকে। শ্রমের মর্যাদা রক্ষায় ও উন্নয়নে নৈতিকভাবে জনগণকে প্রস্তুত করে। শ্রমিক মালিককে ভাই ভাই হিসেবে একে অপরের সহযোগীতা ও সম্পূরক হিসেবে চিত্রিত করে। শ্রমিককে বলেছে নিজের যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও সততার সাথে মালিকের কাজে শ্রমবিনিয়োগ করতে। আর মালিককে বলেছে শ্রমিকের শ্রমের যথার্থ মূল্য দিতে। নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করার ও বিধান ইসলাম দেয়। শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার পারিশ্রমিক প্রদানের কথা বলেছে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় পণ্যকে সহজলভ্য করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, মজুদ করে মুনাফা লাভকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মূল্যনির্ধারণ করার ব্যবস্থায়ও রয়েছে। এতে গণ মানুষের সুবিধাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
আরো পড়ুন: ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার তুলনা
শরীআত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত: ইসলামি অর্থব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল- এ অর্থনীতির সকল বিষয় এবং সামগ্রীক ব্যবস্থাপনা নীতি ও আদর্শ, ইসলামি শরীআত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। শরীআত সমর্থন করে না, এমন কোন নীতি বা কর্মকান্ড ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় বরদাশত করা হবে না। কোন অবস্থায়ই শরীআত বিরোধী কোন তৎপরতা চালাতে দেয় না।
জনকল্যাণমূলক: ইসলামি অর্থনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হল- এটা হচ্ছে গণমানুষের এবং জনকল্যাণমূলক অর্থব্যবস্থা। সমাজের মানুষের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই ইসলামি অর্থব্যবস্থার যাবতীয় কর্মতৎপরতা পরিচালিত হয়। সীমিত অর্থ দিয়ে কিভাবে বৈধ উপায়ে মানুষের অসীম সমস্যাকে সমাধান করা যায় সে চিন্তাই এ অর্থ-ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। মানুষ ও মানবতার অকল্যাণকর কিছু হোক ইসলামি ব্যবস্থা তা চায় না এবং করতে দেয় না।
সুদবিহীন ব্যাংকিং: ইসলামি অর্থব্যবস্থার অন্যতম আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- সুদবিহীন ব্যাংকিং প্রবর্তন। সাধারণ গণমানুষের কল্যাণে সুদবিহীন লেন-দেনের ব্যবস্থা করাই ইসলামি ব্যাংকিং এর উদ্দেশ্য। লেন-দেনেরৎকোন পর্যায়ে ইসলামি অর্থব্যবস্থা সুদকে সমর্থন করে না। এটাই ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য প্রবর্তন: ব্যবসা-বাণিজ্য ইসলামি অর্থনীতির চালিকা শক্তি। মহান আল্লাহ সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণাকে সামনে রেখে এবং জনকল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখেই ইসলামি ব্যবসায় নীতি নির্ধারণ করেছে।
জুয়া-লটারী নিষিদ্ধ: জুয়া ও লটারীর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন মানবতার জন্যে আরও একটি অভিশাপ। এ অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য ইসলাম জুয়া-লটারীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
অপব্যয় ও অপচয় নিষিদ্ধ: ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল- ইসলাম সম্পদের যাবতীয় অপব্যয় ও অপচয়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন:
ক. "খাও, পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না।"
খ. "নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।"
ব্যবসায়-বাণিজ্যে অসাধুতা নিষিদ্ধ: ইসলামি অর্থনীতিতে ব্যবসায়-বাণিজ্যে অসততা, প্রতারণা, ফটকাবাজি, দূর্নীতি, ওজনে ফাঁকি, ভেজাল, মিথ্যা শপথ ইত্যাকার যাবতীয় অসাধুতা নিষিদ্ধ রয়েছে।
সারকথা
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, ইসলামি অর্থ ব্যবস্থাই মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধনে সমর্থ্য একমাত্র অর্থব্যবস্থা। এটা একদিকে যেমন মানুষের মৌলিক এবং অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব নেয়। অনুরূপভাবে এটা নিয়মতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও পূর্ণ নিরাপত্তা দান করে। এটা একদিকে যেমন শোষণ ও লুষ্ঠনের সকল প্রকার পথ বন্ধ করে, অপরদিকে অন্যায়, বিলাসিতা ও লালসা চরিতার্থের প্রাসাদকেও চূর্ণ করে দেয়।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url