মদীনা সনদের গুরুত্ব
এই আর্টিকেলটিতে মদীনা সনদের পরিচয় বলতে পারবেন।ৎমদীনা সনদের মৌলিক ধারাগুলো আলোচনা করতে পারবেন মদীনা সনদ কিভাবে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের মর্যাদা পেতে পারে তা বর্ণনা করতে পারবন, সনদের বিভিন্ন মুখী গুরুত্ব বলতে পারবেন।
ভূমিকা
পূর্বের পাঠে মদীনা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর তিনটি দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ পাঠে আমরা মদীনা সনদ সম্পর্কে আলোকপাত করব। এ সনদ মদীনা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করে। নিম্নে এ সনদের পরিচয় ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হল।
মদীনা সনদ
রাসূল (স.) আল্লাহর নির্দেশে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে মদীনাবাসীর আহবানে সেখানে হিজরত করেন। মদীনায় এসে তিনি দেখলেন তথায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করছে। ১ মূর্তিপূজক সম্প্রদায়, ২. ইয়াহুদী সম্প্রদায়, ৩. খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এবং ৪. মুসলিম সম্প্রদায়। এদের মাঝে একদিকে ছিল আদর্শিক অমিল আর অন্যদিকে ছিল পরস্পর বিরোধ ও বিবাদ।
মহানবী (স) দেখলেন, যদি মদীনার পরিবেশ এমনিভাবে বিরাজিত থাকে তবে যে আদর্শের বিস্তারের জন্য তিনি নিজের জন্মস্থানের মায়া পরিত্যাগ করেছেন তা সফল হবে না। তিনি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলেন মদীনাবাসীর মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি না থাকলে মদীনার কল্যাণ সাধন করা সম্ভব নয়। তাঁদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মবোধের উদ্রেক না করা পর্যন্ত মঙ্গল বয়ে আসবে না। আর ইসলামি দাওয়াতের প্রসার এবং তার জন্য শক্তিশালী একটি পরিবেশও তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি মদীনার সকল আদর্শের নাগরিকের মাঝে একটা ঐক্যের বন্ধন তৈরী করতে উদ্যোগী হলেন।
তিনি সকল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে ডাকলেন। তাদের নিয়ে তিনি আন্তঃসাম্প্রদায়িক বৈঠক করলেন এবং ঐক্য ও সম্প্রীতির আবশ্যকতা বুঝালেন। এরপর তিনি একটি সনদ প্রস্তুত করলেন। যাতে সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য লিপিবদ্ধ করা হল। সকল আদর্শের লোকজন সেই সনদের বক্তব্য মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করলেন। ইসলামের ইতিহাসে এই সনদের নাম হচ্ছে 'মদীনার সনদ'।
মদীনা সনদের ধারাসমূহ
মদীনা সনদে যে সকল ধারা স্থান পেয়েছিল তার কোনটি মুসলমানদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল আবার কোনটি মদীনার ইয়াহুদী কিংবা পৌত্তলিকদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এসব ধারার মূল টার্গেট ছিল মদীনায় শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে মদীনা সনদে মোট ৫০টি বিধান লিপিবদ্ধ করা হয়। নিম্নে সনদের গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো ধারা উল্লেখ করা হল।
১ মদীনা সনদে স্বাক্ষরকারী ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমান সম্প্রদায়সমূহ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং তারা সবাই একটি সাধারু জাতি বা উম্মাহ হিসেবে গণ্য হবে।
২. হযরত মুহাম্মদ (স.) নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রধান হবেন এবং পদাধিকার বলে তিনি মদীনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বময় কর্তা হবেন।
৩. পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে। মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায় বিনা দ্বিধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
৪ কেউ কুরায়শদের সাথে সন্ধি স্থাপন বা মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কুরায়শদেরকে সাহায্য করতে পারবে না।
৫ স্বাক্ষরকারী কোন সম্প্রদায়কে বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে সকল সম্প্রদায় সমবেতভাবে তা প্রতিহত করবে।
৬. স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে। এর জন্য অপরাধী সম্প্রদায়কে দোষী করা চলবে না।
৭. মদীনা শহরকে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হল এবং রক্তপাত, হত্যা, বলাৎকার ও অপরাপর অপরাধমূলক কার্যকলাপ একেবারেই নিষিদ্ধ করা হল।
৮ ইয়াহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে।
৯ মহানবী (স)-এর পূর্বানুমতি ব্যতীত মদীনাবাসীগণ কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না।
১০ স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন বিরোধ দেখা দিলে হযরত (স.) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তার মীমাংসা করবেন।
১১ সনদের শর্ত ভঙ্গকারীর উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হবে বলে লিপিবদ্ধ হয়।
১২ যিনি মদীনায় প্রবেশ করবেন নিরাপদে থাকবেন, যিনিই মদীনা থেকে বের হবেন তিনিও নিরাপদে থাকবেন, তবে যে ব্যক্তি অত্যাচারী ও অন্যায়কারী সে নিরাপদ নয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আশ্রয় দেন যিনি তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেন।
১৩. সনদে স্বাক্ষরকারী কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কেউ যদি যুদ্ধে লিপ্ত হয় তবে মুসলমান ও ইয়াহুদীরা পরস্পরের সহযোগী হবে এবং নিজেদের ব্যয়ভার নিজেরাই বহন করবে, তারা মিলে নির্যাতিতদের সহায়তা করবে।
মদীনা সনদের গুরুত্ব
রাসূল (স.)-এর পূর্বেও এ পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশ ছিল, বিভিন্ন রাষ্ট্র ছিল। তবে সে সব রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল অপরিকল্পিত বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। মদীনা সনদ প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন সেটি ছিল অনন্য, অত্যন্ত সুশৃংখল ও পরিকল্পিত, কারু এ ধরনের একটি সুন্দর পদক্ষেপ ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। বিভিন্ন দিক বিচারে মদীনা সনদের অপরিসীম গুরুত্ব আমাদের কাছে সুস্পষ্ট। নিম্নে মদীনা সনদের গুরুত্বগুলো বর্ণিত হল।
বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান
ক. বিশ্বের ইতিহাসে 'মদীনা সনদ'ই প্রথম লিখিত সংবিধান। এর পূর্বে রচিত ছিল ব্যবহারিক কিছু বিচিছন্ন আইন ও উপদেশ যা সংবিধান হিসেবে গণ্য নয়। তাই ওয়েল হাউজেন, স্প্রেংগার, মুখেলার, গ্রীস, লেভী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এর নতুনত্ব অনুধাবন করেছেন। মদীনা সনদের ন্যায় পৃথিবীর কোন শাসনতন্ত্রই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা কর্তৃক নিঃসৃত এবং স্বীকৃত শাসনতন্ত্রের মর্যাদা পায়নি।
নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের অনন্য দৃষ্টান্ত
যে কোন দেশে বিভিন্ন মতাদর্শের, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বাসবাস করে থাকে। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায় পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ না হতে পারায় তাদের মধ্যে সংঘাত, কলহ ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু লোককে প্রাণ দিতে হয়। মদীনায় সনদ প্রমাণ করে যে, একই রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল সম্প্রদায়ের সকল ধর্মের জনসাধারণের নাগারিক অধিকার সমানভাবে স্বীকৃত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সনদের একটি ধারায় বলা হয়েছে সনদে স্বাক্ষরকারী ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমান সম্প্রদায়সমূহ সকল নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং একটি সাধারু জাতি গঠন করবে। রাসূল (সা.) সনদের এ ধারার আলোকে একটি ঐকাবদ্ধ জাতি গঠন করেছিলেন। তাই একথা প্রমাণিত যে, একটি ঐক্যবদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনে মদীনা সনদের গুরুত্ব অপরিসীম
রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা
কোন এলাকার বা দেশের স্থিতিশিলতা ও শান্তিময় পরিবেশের জন্য সেখানকার রাজনৈতিক ঐক্য খুবই জরুরী। রাসূল (স.) মদীনায় গিয়ে এ দিকটি উপলব্ধি করলেন এবং মদীনা সনদে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করলেন। তাই তিনি সনদের একটি ধারায় উল্লেখ করেছেন যে, সকল সম্প্রদায় মিলে একটি সাধারু জাতি বা উম্মাহ গঠন করবে। রাসুল (স.) এতে সফল হলেন এবং শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করলেন।
নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
মহানবী (স) এর মদীনায় গমনের পূর্বে মদীনার সমাজে যত নাগরিক বসবাস করত তারা সবাই সমান অধিকার ভোগ করতে পারত না। সেখানে উচ্চ শ্রেণীর নাগরিকের সাথে এক ধরনের আচরু করা হত আর নিম্ন ও গরীব শ্রেণীর নাগরিকের সাথে ভিন্ন ধরনের আচরু করা হত। এ ধরনের বৈষম্যের ফলে অপরাধ প্রবনতা বেড়ে যায়, ডাই সমাজের কল্যাণে রাসূল (স.) সনদে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন। তিনি সনদের একটি ধারায় উল্লেখ করলেন যে, সনদে স্বাক্ষরকারী ইয়াহুদী, খৃস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমানসহ সকল সম্প্রদায় সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে, কারও প্রতি কেউ বৈষম্য মূলক আচারু করতে পারবে না। সনদের এ ধারাটি আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের জন্য একটি অনন্য মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
ধর্মীয় উদারতার দৃষ্টান্ত
মদীনার সনদটি ধর্মীয় উদারতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। কল্যাণময় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গঠন অত্যন্ত জরুরী। রাসূল (স.) উক্ত সনদের মধ্য দিয়ে এ কাজটি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। এ সনদ প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বাড়াবাড়ি মোটেই কল্যাণকর নয়। স্বাধীনভাবে প্রত্যেক ধর্মের লোকেরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন
মদীনা সনদের দ্বারা এই প্রথম তৎকালিন আরব দেশে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। গোত্রতান্ত্রিকতার অবসান ঘটায়। অরাজকতা, বিশৃংখলার পরিবর্তে মহানবী (স.) 'এক শাসক, এক আইন' এ নীতি প্রবর্তন করেন। হিট্টি বলেন, "মদীনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্থাপন করে।"
ইসলাম প্রচারের সুযোগ
যে কোন আদর্শ প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রয়োজন অনুকুল পরিবেশ। রাসূল (স.) ইসলামি আদর্শ প্রচার ও প্রসারে ব্যাকুল ছিলেন কিন্তু তিনি ইতিপূর্বে কখনো ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ পান নি। মদীনা সনদ প্রনয়নের পর তিনি ইসলাম প্রচার ও প্রসারের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ ফিরে পেলেন। সনদের ফলে যখন প্রতিটি নাগরিক একে অপরের সহযোগী হয়ে পড়ল তখন দ্বন্দ সংঘাতের অবসান ঘটল। রাসূল (স.) সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিশ্চিন্তে ইসলামের প্রচার করতে সক্ষম হলেন। মদীনার সর্বত্র ইসলামের বাণী প্রচারের সুযোগ হল।
বৈপ্লবিক পরিবর্তন
এ সনদ একান্তভাবেই এক নতুন বিপ্লব আনয়ন করে। আমেরিকার স্বাধীনতা যোঘণা, ফরাসি বিপ্লব ও জাতিসংঘের মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণাপত্র আধুনিক সভ্য জাতিকে যা কিছু দিয়েছে তা ইতঃপূর্বেই মহানবী (স.)-এর মদীনা সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এ যুগান্তকারী সনদ সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব আনয়ন করে।
মহানবীর শ্রেষ্ঠত্ব
মদীনা সনদের মাধ্যমে মহানবীর বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কলহ নিরসনের ক্ষমতা, ধর্ম প্রচারের কৌশল প্রভৃতি অনন্য গুণাবলীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মহানবী (স.) শাসন, আইন, সমর, বিচার প্রভৃতি বিভাগের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন। তাই এসব বিবেচনা করেই অধ্যাপক মুর বলেছেন- "মুহম্মদের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তাঁর যুগেই নয়, বরং সর্বযুগের ও সর্বকালে মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।"
সারকথা
মদীনার সনদ ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। রাসূল (স.)-এর দূরদর্শিতা যে কত বেশী ছিল, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কতটা তীক্ষ্ণ ছিল এ সনদের ধারাগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তা অনুমান করা যায়। লিখিত সংবিধান প্রণয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে যুগ যুগ ধরে এ সনদ গোটা বিশ্ববাসীকে অনুপ্রেরুা যোগাবে। এ সনদ বিশ্ববাসিীর জন্য এক অভূতপূর্ব পাথেয়।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url