পুষ্টির অভাবে শরীরের কি কি ধরনের রোগ হতে পারে

পুষ্টির অভাব ও মানবদেহে এর প্রভাব এবং  শরীরের কি কি ধরনের রোগ হতে পারেএকটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

​সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা অপরিহার্য। পুষ্টি বলতে মূলত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদানের সঠিক সমন্বয়কে বোঝায়। যখন শরীরের কোষগুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে এই উপাদানগুলো পায় না, তখন তাকে পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি (Malnutrition) বলা হয়।

​অপুষ্টি কেবল খাবারের অভাব নয়, বরং সঠিক পুষ্টিকর খাবারের অভাবকেও বোঝায়। নিচে পুষ্টির অভাবে শরীরে কী কী ধরনের রোগ হতে পারে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

​প্রোটিন ও ক্যালরির অভাবজনিত রোগ

​শরীরের কাঠামো গঠন এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। এর অভাবে মূলত শিশুদের মধ্যে দুটি ভয়াবহ রোগ দেখা দেয়:

​ম্যারাসমাস (Marasmus): এটি মূলত ক্যালরি এবং প্রোটিন—উভয়ের চরম অভাবে হয়। এতে শিশুর শরীর কঙ্কালসার হয়ে যায়, চামড়া কুঁচকে যায় এবং বৃদ্ধি থমকে দাঁড়ায়।

​কোয়াশিওরকর (Kwashiorkor): এটি কেবল প্রোটিনের অভাবে হয়। এতে শিশুর হাত-পা চিকন হয়ে গেলেও পেট ফুলে বড় হয়ে যায় এবং শরীরে পানি জমে (এডিমা)।

আরো পড়ুন: থাইরয়েডের কারণে নারীদের গর্ভধারণের জন্য কি কি সমস্যা হতে পারে

​ভিটামিনের অভাবজনিত রোগ

​ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া সচল রাখতে কাজ করে। বিভিন্ন ভিটামিনের অভাবে ভিন্ন ভিন্ন রোগ হয়:

​ভিটামিন এ (Vitamin A): এর অভাবে রাতকানা (Night Blindness) রোগ হয়। দীর্ঘমেয়াদী অভাবে চোখ শুকিয়ে ‘জেরোপথ্যালমিয়া’ হতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।

​ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স:

​বি১ (থায়ামিন): এর অভাবে বেরিবেরি রোগ হয়, যা স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদপিণ্ডকে দুর্বল করে দেয়।

​বি৩ (নিয়াসিন): এর অভাবে পেলাগ্রা হয়, যার লক্ষণ হলো চর্মরোগ, ডায়রিয়া এবং স্মৃতিভ্রম।

​বি১২: এর অভাবে মারাত্মক রক্তশূন্যতা এবং স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দেয়।

​ভিটামিন সি (Vitamin C): এর অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। এতে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে, ক্ষত শুকাতে দেরি হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

​ভিটামিন ডি (Vitamin D): এটি হাড়ের জন্য অপরিহার্য। শিশুদের ক্ষেত্রে এর অভাবে রিকেটস (হাড় বেঁকে যাওয়া) এবং বড়দের ক্ষেত্রে অস্টিওম্যালয়শিয়া (হাড় নরম ও ভঙ্গুর হওয়া) দেখা দেয়।

​খনিজ উপাদানের অভাবজনিত রোগ

​খনিজ উপাদানগুলো শরীরের এনজাইম গঠন এবং হাড়ের মজবুতির জন্য প্রয়োজন।

আয়োডিন: আয়োডিনের অভাবে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায়, যাকে গলগণ্ড (Goiter) বলা হয়। গর্ভাবস্থায় এর অভাবে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে (ক্রেটিনিজম)।

​আয়রন (Iron): এর অভাবে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া হয়। এতে শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়, ক্লান্তি লাগে এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

​ক্যালসিয়াম: ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, যাকে অস্টিওপোরোসিস বলে। এতে হাড় খুব সহজে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

​জিঙ্ক: জিঙ্কের অভাবে ক্ষুধা মন্দা, চুল পড়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া লক্ষ্য করা যায়।

​পুষ্টিহীনতার দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক প্রভাব

​পুষ্টির অভাব কেবল নির্দিষ্ট কিছু রোগেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পুরো শরীরের সিস্টেমকে এলোমেলো করে দেয়:

​রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে সামান্য সর্দি-কাশি বা সংক্রমণও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

​মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি: ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং বি-ভিটামিনের অভাবে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

​হজমের সমস্যা: ফাইবারের অভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কোলনের সমস্যা হতে পারে।

​শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: শিশুদের উচ্চতা ও ওজন বয়সের তুলনায় কম হওয়া (Stunting and Wasting)।

আরো পড়ুন: শরীরে রক্ত বৃদ্ধির জন্য কি কি ধরনের খাবার খাওয়া উচিত

​অপুষ্টি প্রতিরোধের উপায়

​অপুষ্টি থেকে বাঁচতে দামী খাবারের প্রয়োজন নেই, বরং সুষম খাবার (Balanced Diet) নিশ্চিত করা জরুরি।

পুষ্টির উৎস- খাদ্য তালিকা

প্রোটিন- মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শিমের বিচি।

ভিটামিন ও মিনারেল- রঙিন শাকসবজি (পালং শাক, গাজর), ফলমূল।

ক্যালসিয়াম- দুধ, দই, ছোট মাছ।

আয়রন-     কচু শাক, কলিজা, ডালিম।

মনে রাখা প্রয়োজন: অতিরিক্ত রান্না করলে বা সবজি কাটার পর ধুলে অনেক সময় ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। তাই সঠিক উপায়ে খাবার প্রস্তুত করাও পুষ্টি বজায় রাখার একটি অংশ।

উপসংহার

পুষ্টির অভাব কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যা। শিশুদের সঠিক বিকাশ এবং বড়দের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় সকল উপাদান থাকা নিশ্চিত করতে হবে। সামান্য সচেতনতা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস আমাদের অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন, মৌসুমি ফল খান এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন—সুস্থ থাকার এটাই সহজ উপায়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url